সাক্ষাৎকারঃ মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

[শিকড় সন্ধানী ইতিহাস গবেষক মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলামের জন্ম ১৯৫৯ সালের ১লা মার্চ,  কিশোরগঞ্জে। এশিয়াটিক সোসাইটির ‘বাংলাপিডিয়া’ সহ বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপা লেখা অসংখ্য । ইতিহাস ঐতিহ্য, প্রত্নতত্ত্ব, স্থাপত্য, মুদ্রা, সন, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব, আন্ত ধর্মীয় সম্প্রীতি, ঈসা খান, বিদ্যাসাগর, বঙ্গবন্ধু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্বাধীনতার ইতিহাস সহ ৩১ টি বিষয়ে রয়েছে গবেষণা। সম্প্রতি বিহঙ্গের সঙ্গে মিলিত হন এক অন্তরঙ্গ আলাপচারিতায়]  

… বসার ঘরে দু’টি বুকশেলফ। দুষ্প্রাপ্য বইয়ে ঠাসা । ‘আপনার বইয়ের সাম্রাজ্য কি এই ? নাকি আরো আছে ?’   হেসে জানালেন, কিছুদিন আগে সব বই গোছানো হয়েছে। বুকশেলফ গুলোতে নাম্বার দেয়া হয়েছে। বসার ঘরের শেলফ দুটিতে নাম্বার পড়েছে ৮ এবং ৯ । মানে আরো ৭ টা ভেতর ঘরে …।  আলাপের অংশ বিশেষ এরকম …

বিহঙ্গঃ  ইতিহাস চর্চার লক্ষ্য কি?

মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলামঃ উইনস্টন চার্চিল বলতেন ‘The further backward you can look the further forward you can see.’ – ব্যাখ্যা করা দরকার আছে ? 

বিহঙ্গঃ বলা হয় যে, সব ঐতিহাসিকেরই পক্ষ থাকে; পক্ষপাতহীন ইতিহাস তাহলে কিভাবে সম্ভব ?

আশরাফুলঃ না, পক্ষ থাকবে কেন ? ঐতিহাসিক যা খুঁজে পান, প্রমাণ পান, জ্ঞানতঃ সত্য বলে উপলব্ধি করেন তাই লেখেন। তাইতো ইতিহাস। 

বিহঙ্গঃ ইতিহাস কি সবসময় বিজয়ীর পক্ষে লেখা হয়না  ?

আশরাফুলঃ অবশ্যই শাসন ক্ষমতায় যারা থাকে তাদের একটা প্রভাব থাকে। 

বিহঙ্গঃ ঐতিহাসিক পরিবর্তন গুলোর সাথে সাধারণ মানুষের সম্পর্ক কি সবসময় থাকে ?

আশরাফুলঃ সব ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সাথেই সাধারণ মানুষের নিবিড় সম্পর্ক থাকে। জনজীবনে, পেশায়, পোশাকে, সংস্কৃতিতে এর প্রভাব থাকে। যেমন- এই অঞ্চলের মানুষ একসময় সেলাইবিহীন কাপড় পরত। মুসলমানদের আগমনের পর সেলাই করা কাপড়ের প্রচলন শুরু হয়। 

বিহঙ্গঃ সেটা ঠিক আছে। পরিবর্তনের প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর পড়ে। কিন্তু পরিবর্তন ঘটানোর ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের ভুমিকা কতটা থাকে ?

আশরাফুলঃ পরিবর্তনকে যদি সাধারণ মানুষ গ্রহণ না করে তাহলে তো সেটা স্থায়ী হয়না। টেকেনা। 

বিহঙ্গঃ মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস কি লেখা হয়েছে ? নাকি আরো সময় লাগবে মনে করেন ?

আশরাফুলঃ হাসান হাফিজুরের নেতৃত্বে মৌলিক কাজ হয়েছে। তারপর যারা রণাঙ্গনে ছিলেন, তাদের মধ্যে এম আর আখতার মুকুল লিখেছেন ‘আমি বিজয় দেখেছি’। রফিকুল ইসলাম লিখেছেন, মাহবুবুল হক লিখেছেন তিন খন্ডে। তারপর মুহাম্মাদ নুরুল কাদিরের ‘দুশো ছেষট্টি দিনে স্বাধীনতা’ – এগুলো মৌলিক কাজ। আর বিচ্ছিন্ন ভাবেতো অনেকেই লিখেছেন। তবে পেশাদার ঐতিহাসিক যেমন আব্দুল করিম, আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া এঁরা লেখেন নি।

বিহঙ্গঃ বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র কোন দিকটা আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে ?

আশরাফুলঃ এইখানে তিনি খোলামেলা ভাবে লিখেছেন। দলীয় রাজনীতির দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখেন নাই। রাখঢাক ছাড়াই একটা চিত্র পাওয়া যায়। তিনি ইতিহাসবিদ না হলেও ঐতিহাসিকের যে অনুসন্ধিৎসা থাকে এইটা তাঁর ছিল। আরেকটা বই আছে ‘আমার দেখা নয়াচীন’ এইটাও ভাল বই। ইতিহাসের প্রতি উনার একটা আগ্রহ ছিল। একটা ছবি আছে দেখলাম, হাতে বই। আমি লক্ষ্য করলাম বইটার নাম ‘আল বেরুনীর ভারত তত্ত্ব’। 

বিহঙ্গঃ আপনি লিখেছেন নবাব সলিমুল্লাহ তাঁর বাগান বাড়ি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য দান করেছিলেন। এইটা নিয়ে একটা প্রশ্ন আছে, বিতর্কও বলতে পারেন…

আশরাফুলঃ প্রশ্ন থাকলে সেইটা অবান্তর প্রশ্ন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জমির খাজনা যেখানে দেয়া হয় সেটা হল রমনা তহসিল অফিস। আমি সেখানে গিয়েছি। রেকর্ড পত্রে এখনো ওই মৌজার নাম সলিমুল্লাহ মৌজা। ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও এলাকার ইতিহাস’  বইএ আমি ডিটেইল লিখেছি।

                  

বিহঙ্গঃ কি লিখছেন এখন ?

আশরাফুলঃ ‘বই কালি খাতা কলম’ এই নামে একটা বই লিখছি। এগুলোর ইতিহাস নিয়ে। ‘কার্পাস’ গাছ থেকে কলম হত একসময়, এই গাছ এখনো পাওয়া যায়। ‘ভূর্জপত্র’ কাগজ হিসেবে ব্যবহৃত হত এই বাংলায়। বলধা গার্ডেনে আছে এই গাছ এখনো…।

বিহঙ্গঃ বুদ্ধিবৃত্তি চর্চার ভাষা কেমন হওয়া উচিত ?

আশরাফুলঃ অবশ্যই মানুষ যাতে বুঝতে পারে –এমন সর্বজন স্বীকৃত পরিশীলিত ভাষায় হওয়া উচিত।  ‘পরিশীলিত’ শব্দটা বলেছি আমি। এই ক্ষেত্রে ঐতিহ্যকে যেমন গুরুত্ব দেয়া উচিত, আবার আধুনিকতাকেও স্পেস দিতে হবে। মানে ভাষার যে গতিশীলতা- এটা বজায় রাখা।

বিহঙ্গঃ ইতিহাস চর্চা যারা করতে চায় তাদের কিভাবে অগ্রসর হওয়া উচিত ?

আশরাফুলঃ ইতিহাস চর্চার জন্য ব্যাপক এবং সামগ্রিক জ্ঞান থাকতে হবে। খন্ডিত জ্ঞান দিয়ে ইতিহাস চর্চা হয়না। ব্যক্তির ইতিহাস, গাছের ইতিহাস, প্রাণীর ইতিহাস, শিক্ষা, জীবন যাপনের সকল উপাদান সম্পর্কে চর্চা থাকা উচিত। গৌতম বুদ্ধ ৫০ ধরনের হরফ শিখেছিলেন। মাওলানা উবায়দুল্লাহ উবায়দী সোহরাওয়ার্দী, যাকে ঢাকার বিদ্যাসাগর বলা হয়, ৩১ টি বই লিখেছেন বিভিন্ন  বিষয়ে। কোন একক বিষয়ের পন্ডিত ছিলেন না তিনি। ‘আল বেরুনীর ভারত তত্ত্ব’ যেটার আসল নাম ‘কিতাবুল হিন্দ’ – এটি ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসের মৌলিক গ্রন্থ। এটা কিন্তু কোন খন্ডিত ইতিহাস না। ভারতের ধর্ম, দর্শন, জ্যোতির্বিজ্ঞান, সমাজ জীবন, জীবজন্তু, আবহাওয়া, ভুগোল কিছুই বাদ যায়নি।

বিহঙ্গঃ ‘সিয়ারুল মুতাখখিরিন’ সম্পর্কে আপনার কি মত ? সলিমুল্লাহ খান তো বলেছেন এটা ইংরেজরা লিখিয়েছে সিরাজ- উদ-দৌলার বিপক্ষের লোক দিয়ে।

আশরাফুলঃ বইটার লেখক গোলাম হোসেন তবাতবাঈ ফারসী ভাষায় লিখেছিলেন এটা। লেখক সিরাজ-উদ-দৌলার শত্রু পক্ষের লোক ছিল এটা ঠিক। ইংরেজরা লিখিয়েছে কিনা জানা নেই। শাসকদের প্রভাব তো থাকতেই পারে। তবে সিয়ারুল মুতাখখিরিনে ইতিহাসের অনেক প্রয়োজনীয় উপাদান আছে। যেগুলো পড়তে হবে অন্য লেখার সাথে মিলিয়ে, যাচাই করে। তাহলে সঠিক ধারণা পাওয়া যাবে।

বিহঙ্গঃ এই উপমহাদেশের ইতিহাসের সাথেতো সাম্প্রদায়িকতার একটা নিবিড় যোগসূত্র আছে । সেক্ষেত্রে উপমহাদেশের ইতিহাস চর্চার সাথে সাম্প্রদায়িকতা চর্চার কি একটা ঝুঁকি থাকে ?

আশরাফুলঃ  না। কারণ সাম্প্রদায়িকতার ইতিহাস খুব পুরানো না। এটা শুরু হয়েছে উপমহাদেশে ইংরেজদের আগমনের পর। সুলতানি আমলে সাম্প্রদায়িকতা ছিলনা। তার আগেওনা। এই বাংলায়ও শাসক পরিবর্তন হয়েছে, মানুষ ধর্ম পরিবর্তন করেছে, কিন্তু সাম্প্রদায়িক সংঘাত ছিলনা। আলেকজান্ডারের লোকেরা এই এলাকার বর্ণনা লিখেছে- সেখানেও কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার কথা নাই।

বিহঙ্গঃ সাম্প্রতিক যে ঘটনা গুলো ঘটল, মন্দিরে পবিত্র কুরান রাখা বা মন্দিরে হামলা –এগুলোর পেছনে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কোন প্রভাব আছে কিনা?

আশরাফুলঃ সাম্প্রদায়িক রাজনীতি বলে কিছু নেই। যেটা আছে সেটা হল সম্প্রদায়কে ব্যবহার করে রাজনীতি। বলতে পারেন মেকিয়াভেলির রাজনীতি, যার কোন আদর্শিক ভিত্তি নাই।

বিহঙ্গঃ বিভক্তি কি রাজনীতির মূলধন ?

আশরাফুলঃ Divide and rule একটা সনাতনি প্রথা। এইটা শুধু দেশে না, আন্তর্জাতিক ভাবেই আছে। এর জন্য আমরা সবাই দায়ী। যারা ধর্ম-চর্চা করে তাদের মধ্যেও আছে। 

বিহঙ্গঃ একটা নতুন প্রজন্ম কি আপনার চোখে পড়ছে যারা রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পারিক দোষারোপের চেয়ে বেকারত্ব , শিক্ষা, স্বাস্থ্য –এসব বিষয়ে বেশি আগ্রহী ?

আশরাফুলঃ হ্যা, কিছু লক্ষণ আছে। এটা হয়তো ন্যাচারালি ঘটছে। মানে পরিবেশ পরিস্থিতির মাধ্যমে। তবে এটা এখনো কোন ফর্মে আসেনি। এরা যদি নিজেদের স্থিতি আনতে পারে – মানে সত্যকে সত্য বলা, ভালকে ভাল বলা, মন্দকে মন্দ- তাহলে একটা সময় হয়তো বেটার কিছু হতে পারে। 

বিহঙ্গঃ এরকম একটা প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণের সক্ষমতা কি আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তৈরি হচ্ছে ?

আশরাফুলঃ না। যতদিন অপরাধ মুক্ত নেতৃত্ব না আসবে, নেতৃত্ব বাছাইএর ক্ষেত্রে যতদিন অপরাধ মুক্ত ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেয়া না হবে, ততদিন এটা হবেনা। 

বিহঙ্গঃ সংঘাত মুক্ত একটা ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার জন্য আপনার পরামর্শ কি ?

আশরাফুলঃ এইখানে আমার কথা হল বাংলাদেশকে জানা, বাংলাদেশকে বুঝা- এইটার চর্চা বাড়াতে হবে। নতুন প্রজন্ম যখন জানবে যে, আলেকজান্ডার পর্যন্ত এই বাংলায় আক্রমন করতে ভয় পেয়েছে, যখন শুনেছে এখানকার শাসকদের বিশাল হস্তিবাহিনী আছে, প্রায় ৫০০০ হাতি ছিল… এই বাংলাদেশ কোন দিন পরাধীনতা মানেনি, তার আত্ম-অহংকার ফিরে পাবে। এজন্য বাংলাদেশ স্টাডিজকে এগিয়ে নিতে হবে। এই বাংলার মসলিনের জন্য সম্রাজ্ঞী নূরজাহান পথ চেয়ে থাকত, বৃটেনের রাণি মসলিনের জন্য ব্যাকুল ছিল- এই ঐতিহ্যের আমরা উত্তরাধিকার- এই দীক্ষা যদি জাগিয়ে তোলা যায় তাহলে সম্ভব। 

বিহঙ্গঃ অনেক ধন্যবাদ আপনাকে ।

আশরাফুলঃ আপনাকেও ধন্যবাদ।

2 thoughts on “সাক্ষাৎকারঃ মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম”

  1. বিহঙ্গের পক্ষ থেকে অনির্ধারিত অর্থাৎ তাৎক্ষণিক এ সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন সিরাজুল ইসলাম । একটা সুন্দর অবয়বে সেই কথাগুলো তুলে ধরার জন্য বিহঙ্গকে ধন্যবাদ। তাৎক্ষণিক বয়ানে কোন ভুল-ত্রুটি থাকতেই পারে। দৃষ্টি আকর্ষণ করলে খুশী হবো । শুভ কামনা সবার জন্য।

  2. সাক্ষাৎকারটিতে অনেক কিছু জানার, বোঝার ও উপলব্ধি করার আছে। সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ।

Leave a Reply to Dr. Md.Showkat Ali Cancel Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top