রম্য রচনার প্রবাদপুরুষ মুজতবা আলী

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রম্য লেখক মুজতবা আলী (১৯০৪-১৯৭৪)। যিনি আঠারোটি ভাষায় ভিন্ন ভিন্ন ভাবে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন অত্যন্ত সাবলীলতায়। পরাধীন দেশের মানুষ হয়েও তিনি ছিলেন স্বাধীন সত্তার অধিকারি । আকাশের বিশালত্বে জমিনের পাটাতনে যার পরিভ্রমণের অভিজ্ঞতায় আমাদের সাহিত্যে এক নতুন দিকের সূচনা ঘটিয়েছেন। সুনীল যেমন সারা বিশ^ ভ্রমনে অভিজ্ঞতার ঝুলি ভরেছেন সাহিত্যের পাতায় তেমনি পৃথিবীর মানচিত্রে সৈয়দ মুজতবা আলী রম্য রচনার জগতে এক স্বরণীয় বরণীয় ব্যক্তিত্ব।

বাংলাদেশে সৈয়দ মুজতবা আলীকে নিয়ে যতখানি চর্চা হয় তারচেয়ে তিনগুণ বেশী চর্চা হয় কলকাতায় -এক সাহিত্য আলোচনায় একথা বলছিলেন তাঁর মেয়ের জামাই বরেণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুস্তাফা জামান আব্বাসী। বাংলা সাহিত্যে তাঁর সার্থক রোমান্টিক উপন্যাস শবনম রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতার পর আর একটি পাওয়া দুষ্কর। রম্য রচনায় এই প্রবাদপুরুষ বাংলা সাহিত্যে যে দায়িত্ব নিয়েছেন তা হলো মানুষকে হাসানো, যদিও তিনি জানতেন মানুষকে হাসানো সহজ কাজ নয়। অতি সহজে যে কোনো বক্তব্যকে নিয়ে তিনি হাস্যরস করেছেন। অত্যন্ত গম্ভীর বিষয়কে তিনি রম্য কায়দায় উপস্থাপন করেছেন। তাতে বিষয়টি হালকা হয়নি বরং আরো উপভোগ্য, হৃদয়গ্রাহী হয়েছে। রম্য রচনায় গভিরের  রস পাঠক যাতে সহজে আস্বাদন কারতে পারে, একটু হলেও হাসির খোরাক জোগায় সে চেষ্টাই তিনি করে গেছেন আমরণ। বর্তমান ডিজিটাল যমানায় বিজ্ঞান নির্ভর ব্যস্ত সময়ে আমরা বড় একঘেয়েমি হয়ে যাচ্ছি দিনদিন । এই এক ঘেয়েমিকে  দূরে সরাতে হাস্যরসের প্রয়োজন। বুদ্ধির চমৎকার ব্যবহারে একটা তুচ্ছ বিষয় মুজতবার আলীর হাতে পড়ে চরম উপভোগ্য হয়ে উঠে। বক্তব্যেও রয়েছে গভীর জীবনবোধ। একঘেয়ে জীবনে তার রচনা পড়লে হাসির রোল উঠতে বাধ্য বলেই সর্বজন স্বীকৃত। হাস্যরসের প্রাণভ্রমর এই লেখক বাংলা রম্যরচনার প্রাণপুরুষ।

 তাঁর ‘রসগোল্লা’ পড়ে কে না হাস্যরসে হাবুডুবু খেয়েছে? রসগোল্লা রম্যগল্পের পাঠক তা মাত্রই স্বীকার করবেন। কাহিনীটাও বেশ চমৎকার। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ঝান্ডুদা বন্ধুর মেয়ের জন্য এক টিন প্যাকেটজাত মিষ্টি নিয়ে যাচ্ছেন। ইতালির কাস্টমস ঘরে কাস্টমস অফিসারের সাথে তা নিয়ে বাকবিতন্ডা হয়। কাস্টমস কর্মকর্তাকে তিনি বোঝাতে ব্যর্থ হন যে, প্যাকেট খুললে মিষ্টি নষ্ট হয়ে যাবে। কাস্টমস অফিসারের ভাঙাচোরা চেহারার বর্ণনা আমাদেরকে রসগোল্লা খাওয়ার আগেই রসে মজিয়ে ফেলে। তাছাড়া ঝান্ডুদার পোশাক, ব্যাগের উপরে বিভিন্ন দেশের কাস্টমস হাউজের সিল সব কিছুতেই রয়েছে রসের অগাধ প্রাচুর্য। সেখানে নানা হাস্যরসাত্মক দৃশ্য ঘটানোর পরেও ঝান্ডুদাকে মিষ্টান্নর প্যাকেট খুলতে হয়। আর প্যাকেট খোলার পরে ঘটে সেই আসল ঘটনা। পাঠক মাত্রই সে ঘটনায় হেসে ফেলবেন। একগুয়ে কর্মকর্তার কারণে ঝান্ডুদা প্যাকেট খোলে। কিছু বুঝে উঠার আগেই ঝান্ডুদা ক্ষেপে গিয়ে রসগোল্লা নিয়ে চুঙ্গিওয়ালার নাকে-মুখে লেপে দেয়। আর সকলকে রসগোল্লা দেয়। রসগোল্লার রসে মজে ফরাসি উকিল আড়াই মিনিট চোখ বন্ধ করে রেখেছিলেন। সকলেই রসগোল্লাার রসে মজে আবার রসগোল্লা খেতে চায় কিন্তু ততোক্ষণে রসগোল্লা শেষ। এই রম্য রচনার প্রতিটি চরিত্র হাস্যরসের উদ্রেক করে। কাহিনীটা সাধারণ হলেও পাঠক পড়লে হাসতে বাধ্য। রসগোল্লার রসে মজে ঝান্ডুদাকে ক্ষমা করে দেন কর্তৃপক্ষ। এই যাত্রায় ঝান্ডুদা বেঁচে যান।

পৃথিবীতে মানুষ যে কোন কাজ করুক তার পেছনে উদ্দেশ্যে থাকেÑ সুখ। সুখের জন্য সৃষ্টির শুরু থেকে মানুষ নিরন্তন ছুটে চললেও সুখ যে কিসে তা এখনো কেউ নির্দিষ্ট করে বলতে পারেনি। কিন্তু সুখ পাগলা ঘোড়ার মত ছুটিয়ে নিয়ে চলছে মানুষকে। কেউ হয়তো সাময়িক সুখকে বশ করতে পারলেও স্থায়ী রূপ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। আসলে সুখ কি? এর পরিচয় কি? এর সংজ্ঞা ব্যক্তি বিশেষে ভিন্ন ভিন পরিচয়। সুখ হচ্ছে একান্ত অনুভবের বিষয়। জগতের সব কিছুর মধ্যে সুখ আছে। আমাদেরকে সেটা উপলব্ধি করে নিতে হয়। সুখ আপেক্ষিক বিষয়। কেউ খেলে আনন্দ পায়। কেউ খেয়ে, কেউ গল্প করে। কেউ অন্যকে ভালোবেসে। যে যেভাবে পারে সুখে থাকতে চেষ্টা করে। এক জন যার মধ্যে সুখ পায় অন্যজন তার মধ্যে সুখ নাও পেতে পারে। এই বিষয়ে সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর ‘সুখী হবার পন্থা’ শীর্ষক রম্যপ্রবন্ধে লিখেছেন। বিভিন্ন মনীষীর সুখ সম্পর্কে অনুভূতিগুলোকে প্রসঙ্গক্রমে তিনি উল্লেখ করেছেন। যেখানে রয়েছে লালন, কালিদাস, চন্ডীদাস, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ওমর খৈয়াম, চার্বাক, জার্মানের হাইনে, গ্যাটো প্রমুখ। গ্যাটের কথা উদ্ধৃতি দিয়েছেন তিনি এভাবেÑ সুখ হাতের কাছেই থাকে; তবে তাকে ধরার কৌশলটি শিখতে হয়। চার্বক বলেছেনÑ ঋণ করে হলেও ঘি খাও; কারণ দেহ ভস্মীভূত হবে। শীতের রাতে কম্বল (কাঁথা বা লেপ) সরে গেলে আবার তা টেনে শরীরে দিলে সুখ লাগে। খৈয়ামের পাশে বসে কেউ সংগীত পরিবেশন করলে তা বিজন প্রান্ত হলেও তার সুখ লাগে। এমন অনেক রকম সুখের কথা তিনি উল্লেখ করেছেন রচনাটিতে। আসলে দুঃখকে জয় করাই সুখ। একাধারে কেউ সুখ পায় না , আবার কেউ একাধারে দুঃখও পায় না। সুখ-দুঃখ একই মুদ্র্রার এপিঠ-ওপিঠ। সুখ অনুভূতির ব্যাপার। দুঃখকে কঠোর সাধনার মাধ্যমে জয় করে সুখের সোপানে আরোহণ করাই হচ্ছে প্রকৃত সুখ। যে যেখানে আছে সেখান থেকে আত্মতুষ্টি হচ্ছে প্রকৃত সুখ। সুখ খোঁজার জন্য লালন দিল্লি গিয়েছিলেন। আসলে সুখ কি তিনি পেয়েছিলেন? পাননি। সুখÑ যার যে জায়গা আছে, সেখানে থেকে তুষ্টি অর্জন করতে পারলেই সুখের দেখা পাওয়া সম্ভব।

আজকাল প্রায় শোনা যায় স্ত্রী নির্যাতন মামলা আছে স্বামী নির্যাতন মামলা নেই! আসলে পুরুষ শাষিত সমাজে স্বামী নারীদেরকে নির্যাতন করে পেশি শক্তির বলে। কিন্তু পেশি শক্তিতে না পারলেও মানসিক শক্তিতে নারীরাও নির্যাতন করতে পারে। আধুনিক যুগে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হচ্ছে। অনেক সংসার আছে যেখানে নারীরা কর্তৃত্ব করে। এমন কি স্ত্রীরা মানসিক উৎপীড়নে স্বামীর জীবনকে বিষিয়ে তোলে। এটা বিপরীত ঘটনা বলে হাসির কারণ হতে পারে। এমন কাহিনীর সাথে একটু রঙ চড়িয়ে সৈয়দ মুজতবা আলী লিখেছেন ‘দাম্পত্য জীবন’। যেখানে স্বামীরা স্ত্রীর নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে মিছিল-মিটিং করে। এমন একটি সভা চলা কালে শোনা গেল স্ত্রীরা ঝাটা নিয়ে সভা ভন্ডুল করতে আসছে। এই খবর রটার সাথে সাথে সভাস্থল খালি হয়ে গেল। একমাত্র সভাপতি সেখান থেকে নড়ল না। পাঠকের মনে হতে পারেÑ তাহলে কি একমাত্র সভাপতি বীরপুরুষ? না, কেউই বীরপুরুষ নয়। দারোয়ান গিয়ে দেখল সভাপতি মারা গেছে। সভাপতির চিরতরে পালানোটা ট্রাজেডি কিন্তু এখানেও না হেসে পারা যায় না। পাঠকের মনের কোণে অদ্ভুত হাসির সুড়সুড়ি দেয়। এই রকম ট্রাজেডি আমাদের আবেগের সাগরে ভাসিয়ে দেয়। প্রচন্ড হাস্যরসে আমরা খিলখিলিয়ে উঠি। স্বামী-স্ত্রীর সুখের সংসারও আছে। আবার পুরুষই স্ত্রীকে দজ্জাল হয়ে উঠতে বাধ্য করে। স্বামীর বিভিন্ন মূর্খতার কারণে অধিকাংশ এমন হয়। এই সব বিষয় নিয়ে হাস্যরসের রম্য রচনায় সিদ্ধহস্ত  আমাদের সৈয়দ মুজতবা আলী।

শান্তিনিকেতন ও রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তিনি লিখেছেন ‘রবি-পুরাণ’। শান্তি নিকেতনে মারাঠি ছেলে রবীন্দ্রনাথকে সন্ন্যাসী ভেবে তাকে একটি আধুলি দিয়েছিলো। রবিঠাকুর সে নৈবেদ্য গ্রহণ করেছিলেন। এখানে মুজতবা আলী আরো যোগ করেছেন রবিঠাকুরের কাছ থেকে একবার একটা লোক দশ টাকা ধার নিয়ে বলেছিলÑ চির ঋণী হয়ে থাকলাম। রবিঠাকুর তার নাতি দিনেন্দ্রনাথকে বলেছিলÑ লোকটার শত দোষ থাকলেও একটা গুণ ছিল। লোকটা সত্যভাষী। এই কাহিনী আমাদের রসের সন্ধান দেয়। হাসির কারণ হয়। কিন্তু মুজতবা আলীর উপস্থাপনা শৈলীতে তা সুক্ষ এবং মনোমুগ্ধকর হয়ে উঠে।

পৃথিবীতে সবচেয়ে সত্য মৃত্যু। যা জীবন মাত্রই গ্রহণ করবে। জীবনের করুণতম উপলব্ধিতেও মুজতবার দৃষ্টি ছিল অত্যন্ত প্রখর। রবিঠাকুর শৈশবে মাকে হারান। সাত-আট বছরের সময় বিয়ে করা কাদম্বরীকে হারান বাইশ বছর বয়েসে। একচল্লিশ বছরে গেল দ্বিতীয় স্ত্রী। তারপর মেয়ে রেনুকা মারা যান তারপরে বড় মেয়ে, ছেলে, নাতি একে একে চলে যেতে থাকে কিন্তু এত মৃত্যুর মধ্যেও রবীন্দ্রনাথ অপরাজেয়। হাস্য রসিক মুজতবার মধ্যে যে করুণ রস ছিল তা ‘মৃত্যূ’ শীর্ষক রচনা পড়লে বোঝা যায়। জীবন রসিক দরদি এই শিল্পীর কলমে হাস্যরসের মত করুণ রসও প্রজ¦ল। জীবনের সহজ-সরল দিক নিয়ে তিনি যেমন হাস্যরসের যোগান দিয়েছেন তেমনি গম্ভীর দিকগুলোও তুলে এনেছেন সহজ করে। জীবনকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষেণ করার অন্তর্দৃষ্টি ছিল মুজতবা আলীর  বলেই তার পরিবেশিত হাস্যরসের মধ্যে পরিমিত জীবনময়তা ছিল। জীবনের বেদনাক্লিষ্ট এবং করুণতম অভিজ্ঞতাকে মুজতবা সংবেদনশীলতার প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা দিয়ে দেখতে পেয়েছেন বলেই বাংলা হাস্যরস সাহিত্যে তার অবস্থান শাশ্বত।

সৈয়দ মুজতবা আলী জীবনে ঘটে যাওয়া নানা তুচ্ছ ঘটনাকে অবলম্বন করে গড়ে তুলেছেন রম্য রচনার এক নতুন দুনিয়া। যেখানে একবার ভ্রমণ করলে হাসিতে জীবন ভরে যায়। মুজতবার হাতে পড়ে যেকোনো ঘটনা একবারে আমোদের মর্মে প্রবেশ করে হাসির খোরাক জোগায়। কখনো করুণ রস কখনো হাস্য রসে তার রচনা পরিপূর্ণ। আলোর বিপরীত যেমন অন্ধকার তেমনি হাস্যরসের বিপরীত করুণ রস। তিনি জীবনের করুণ দিকগুলো সুস্পষ্টভাবে জানতেন বলেই জীবনের হাস্যরসের দিকগুলো নিপুনভাবে উপস্থাপন করতে পেরেছিলেন। তার লেখনিতে হাস্যরস কিন্তু বাস্তব বিবর্জিত নয়। বাস্তবকে ধরে সত্য উন্মোচনে তিনি সদা হাস্যরসের রম্য সৃষ্টি করেছেন। এই হাস্যরসের রম্য রচনার কারণে বাংলা সাহিত্যে তিনি চিরকাল প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবেন। বলা যায় পশ্চিম বাংলায় এখনও তাঁর সাহিত্যের আলোচনা বাংলাদেশ থেকে বেশী। আমাদের রম্যসাহিত্য আবার জেগে উঠুক সৈয়দ মুজতবা আলীর দেখানো পথে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top