আমাদের আজকের স্বরণীয় কবি গোলাম মোহাম্মদ। ২০০২ সালের ২২ আগষ্ট সুন্দরের কবি চলে গেছেন কায়ীক জীবনের ওপারে।
মাগুরা জেলার মোহাম্মদপুর থানার সবুজ এক গ্রাম গোপালনগরে তাঁর জন্ম ১৯৫৯ সালে ২৩ এপ্রিল। সবুজ গাছ-গাছালির মেলা, নদী, পাখি, ফুল তার মনন গঠনে ভূমিকা রেখেছিলো। তাই তার কবিতায় বারবার ফিরে ফিরে এসেছে সহজ ও সারল্যে ভরা চিরসবুজ গ্রাম। গ্রামের সরল মনের মানবিক বোধসম্পন্ন লোকজন, পাড়া-প্রতিবেশী, শিক্ষকবৃন্দ, কবির চিন্তা, মনন গঠনে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিলো। অনেক কবিতায় তা স্পষ্ট হয়েছে। ছোট বেলায় আল্লাহর কালাম পড়া মন-মস্তিস্কে গ্রাম এবং আশ-পাশের বিশ্বাসী মানুষ কবিকে আত্মিক উৎকর্ষের দিকে ধাবিত করেছে। তার বহুমুখী প্রতিভার স্ফুরণে তারই সাক্ষ্য বহন করে। বিশেষ করে স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভের জন্য যে পবিত্র আত্মার অধিকারী হওয়ার দরকার, কবির সৃষ্টি সেদিকেই মনোযোগ আকর্ষণ করেছে বেশি। কবি বলেছেন:
হে মানুষ তুমি সুন্দর হও
বৃক্ষ, পত্র, ফুল দেখনি! ঝরনার নিক্কন শুনেও
কেন তুমি সুন্দরের পাগল হতে পার না।
………………………………….
সুন্দর হও সাদা মেঘ শরতের মতো
বকের ডানার মতো জোছনা, কুয়াকাটা,
সুন্দরবন, মাধবকুন্ডের ঝরনার মতো।
নীলভেদী সাদা মিনার যেমন
পিকাসোর চিত্রকলার মতো প্রতিবাদে বিভাসে
তুমি সুন্দর হও।’
‘ফিরে চলা এক নদী’ কাব্যগ্রন্থের চতুর্থ কবিতা ‘প্রতিবাদে বিভাসে’। কবি গোলাম মোহাম্মদের চেতনায় চিন্তনে যে নিরন্তর সৌন্দর্য পিপাসা তা মরিচার আস্তরে আবৃত কোনো অন্ধ আত্মার নির্বোধ সৌন্দর্য পিপাসা নয়। সে উদগ্র সৌন্দর্য পিপাসা নিষ্ঠুরতায় অথবা হিংস্রতার পঙ্কিলতায় বহমান নয়, নয় কোনো স্বার্থান্ধ আত্মার আগ্রাসন। কবি গোলাম মোহাম্মদ তার সমস্ত কবিতায়, ছড়ায়, গানে অথবা প্রবন্ধে গদ্যে কিংবা ভাষণে যে সুন্দরের সাধনার পিপাসায় অবগাহন করেছেন, তা এক বিভাসিত প্রতিবাদের ভিতর দিয়ে প্রকাশিত। বিনা রক্ত ক্ষরণে কালো মেঘকে পরাজিত করে সূর্য যেমন সত্য হয়ে উঠে। মানুষ আর প্রকৃতির সকল জঞ্জালের বিরুদ্ধে আলোকিত লড়াই করে সাগর নদী অথবা পদ্মা, মধুমতি অথবা হিজলবন, স্বচ্ছ আর নির্মল হয়ে ওঠে। কবির সুন্দরের সাধনা তেমনি প্রতিবাদে বিভাসে। আর এই সাধনার সুনির্মল পথ মাত্র একটিই। কবি তাঁর ‘অদৃশ্যের চিল’ কাব্যগ্রন্থের ‘বিশিষ্ট রসায়ন’ কবিতায় বলেছেন,
শক্তিমান আত্বা ও মননের সম্পৃক্ত দ্রবণে
পরিণত সময়কে প্রবাহিত করলে
মূল্যবান ধাতব সুকৃতি উৎপন্ন হয়।
আয়নিক বন্ধনে সোডিয়াম-ক্লোরিন যেমন
খাদ্যলবণ হয়ে যায়।
খাদ্য লবণ ছাড়া কোনো খাদ্যই যেমন রুচিকর হয় না তেমনি আত্মাকে মননের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে বিশুদ্ধ না করলে তা পৃথিবীর কল্যাণে ব্যয়িত হতে পারে না। এই কবিতায় তিনি লিখেছেন,
আত্মার অনুগুলো কখনও কখনও আণবিক শক্তিমান হয়
বেষ্টিত শত্রুর লিপ্ততা ফুঁ করে ফেলে
অতল সমুদ্র থেকে সাবমেরিনের মত
বয়ে আনে ইলেকট্রনিক বিজয়।
মূলত আত্মাই মানুষের সকল বড়ত্বের
বিশিষ্ট রসায়ন।
কি সুগভীর দৃষ্টিভঙ্গিমায় কবির অর্ন্তলোক উদ্ভাসিত। মূলত সকল প্রাণীর মধ্যে মানুষ তখনই মানুষ হয়ে ওঠে যখন তার আত্মা পবিত্রতার সমুদ্রে ডুবে ডুবে , ঘষে ঘষে, মেজে মেজে স্বচ্ছ এক সুঘ্রাণে ভরপুর হয়। ছড়ায় সে ঘ্রাণ, নিজের পাশে, চারিপাশে, চতুর্দিকে।
কবি গোলাম মোহাম্মদের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান হচ্ছে সেই সুনির্মল পবিত্র আত্মা যা তার কর্মে সৃজনে চিন্তনে স্বপ্নে জাগরণে মিলেমিশে হয়েছে একাকার। তিনি অদৃশ্যের চিল কাব্য গ্রন্থে ‘অদৃশ্যের চিল’ কবিতায় তা অকপটে বলে গেছেন:
দেহ নেই, প্রেম আছে, কবিতা আত্মার মতো
অদৃশ্যের চিল।
তিনি সুনির্মল পবিত্র আত্মা নির্মাণে এতো বেশি যত্নশীল, এতো ব্যাকুল, এতো আকুল যে তার সৃষ্টিই এখন আত্মার সদৃশ। যদিও কবিতার আত্মার স্বরূপ উদঘাটনের চেয়ে কবিতার শরীরের পরিচয়টা আমাদের কাছে সহজ হয়ে ওঠে। কবিতার ভাষা, ছন্দ, উপমা, ব্যঞ্জনা অলংকার সবই আমাদের কাছে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য এবং স্বচ্ছ। মনে হয়, আমরা যারা আমাদের আত্মাকে আমাদের দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধকরে রাখি তখন কবিতার দেহসৌষ্ঠব দেখে আমরা মুগ্ধ হই অথবা মুখ ফিরিয়ে নেই। কিন্তু দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে আত্মাকে মুক্তি দিতে পারলেই আত্মা তখন ছন্দে, বর্ণে, ভাষায় পবিত্রতায় অনবদ্য কবিতার মতো সুন্দর হয়ে ওঠে। আর তখনই কবি গোলাম মোহাম্মদের অর্ন্তলোকের সৌন্দর্য অনুভূত হয়, দৃষ্টিগোচর হয়:
১.
হৃদয়ে জমেছে অনেক কয়লা কালো
যতনে মরমে আবে জমজম ঢালো
হীরকের গায়ে ধুলার আস্তরণ
কতক্ষণ থাকে মিথ্যার প্রহসন
হৃদয়ে হৃদয়ে ফুটাও হাসনাহেনা
দেখ জমে উঠে কত না আকর্ষণ।
(অদৃশ্যের চিল/ঝড়ের রাত্রে)
২.
মানুষের ছায়ারাই তো মানুষ নয়
প্রস্তরে মুর্তিরাও নয় মানুষ
মানুষের আকৃতিও ভেতরের মানুষ নয়
মানুষের ভেতরই মানুষ থাকে
ফুলের ভেতরে থাকে যেমন ফুল।
(ফিরে চলা এক নদী/ভেতরের মানুষ)
৩.
দৃষ্টির গভীরতাই শিল্পীকে অমরতা এনে দেয়
আশ্চর্য মেঘেরা বর্ণময় কারুকাজের ভেতর মানবিক হয়ে ওঠে।
অন্ধরা কিছুই দেখে না
মানুষ অন্ধ হলে তাই ব্যাহত হয় শিল্প-সুন্দর ও মানবতা।
(ফিরে চলা এক নদী/অন্ধরা)
৪.
হাতটারে সাফ কর সাফ করো দিল
মুছে যাবে যন্ত্রণা যতো মুশকিল
তাল তাল আন্ধার পাপ করো দূর
পুষ্পিত দিন পাবে ঘ্রাণ সুমধুর।
(অদৃশ্যের চিল/হাসতো নিখিল)
কবিত্ব কোনো নৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক বা অন্য কোনো শক্তি নির্ভর নয়। কবিত্ব সম্পূর্ণ অলৌকিক শক্তি। পবিত্র আত্মার কোন সাধক যখন এই অলৌকিক কবিত্বশক্তির শিল্পী হয়ে ওঠেন তখন কবিতা ভাষা, উপমা, ব্যঞ্জনা আর অলঙ্কারের মাধ্যমে মানবাত্মার সর্বাঙ্গীন পুষ্টি সাধন করে। মানুষের বৈষয়িক কর্মসাধনে নৈতিকতায় ভূমিকা রাখে, আবার মানুষ যখন কর্মজগৎ থেকে পরিশ্রান্ত হয়ে অবসরে কল্পনার জগতে বিচরণ করে তখন কবিতাগুলো তার আধ্যাত্মিক শক্তিকে বলিষ্ঠ করে। এখানেই স্বার্থকতা একত্ববাদী কবির। এইসব কবিতা তার স্বাক্ষর বহন করে:
১.
তাঁর দুই হাতে নিয়ামত সম্ভার
সে দান কেমনে করবে অস্বীকার
চোখ মেলে দেখ সেই স্নেহময়
অনু অন্তরে প্রতিক্ষণ সঞ্চার।
(অদৃশ্যের চিল/কারুকাজ ভরা)
২.
আমি যে সুপথ চাই আলোকিত সরল সুপথ
যে পথে হেরার নূর কামেল ইনসান
নববীর মিম্বর যেনো জীবন সমাজ
রূহ যার কালেমার চিরন্তন বাণী
(অদৃশ্যের চিল/আমি যে সুপথ চাই)
৩.
এক বলে ছয় রান মানুষেই করে
তোমার ইনিংস হোক পুষ্পময় নতুন রেকর্ড
সাহস বুদ্ধির খেলা অনিশ্চয়ে ঘেরা
সতর্ক মাঝির মতো ঢেউ ঠেলে ঠেলে
তরণী তোমার নাও উৎসবের তীরে।
(ফিরে চলা এক নদী/সময়ের ক্রিকেট)
৪.
তুমি কি দেখনা
ফুলের পাপড়িতে মৌমাছি কেমন ঘুরে বেড়ায়
দীঘল ভালোবাসায় সিক্ততায় নত হয়
আমি নত হই পরম সত্যের কাছে
এ আমার অধিকার
(ফিরে চলা এক নদী/দীঘল মুগ্ধতা)
অর্ন্তলোক যার সত্যের আলোয় ঝলমল, পুষ্পিত আত্মা যার মানবতার কল্যাণে কেঁদে ওঠে, অন্যের দু:খে চোখ থেকে অশ্রুঝরে, হৃদয় আবেগে কাঁপে থরথর। কিছু কবিতা আছে যা তাদের মনে জাগায় অনুপ্রেরণা এবং অত্যাচারীর প্রতি রুদ্রোরোষে ফুঁসে দাঁড়ায় চিন্তা। কবি গোলাম মোহাম্মদের নির্মল সবুজ কচি ক্ষেতের মতো হৃদয় থিরথির করে কাঁপে, কাঁদে, অস্থির হয়ে ওঠে শব্দে ভাষায় অনিবার্য প্রতিবাদে:
১.
যার ঘর নাই তার ভালোবাসা কী?
ফিলিস্তিনীদের কেবল যুদ্ধই মানায়
মৃত্যু লাশ ধ্বংসের ভেতর দিয়ে
নতুন নতুন যুদ্ধে প্রতিদিন ধাওয়া করে মৃত্যু
উদ্বাস্তু শিবির, উদ্বেগ, প্রেমহীন পৃথিবী
ক্ষুধা কান্না স্বজন হারানোর যন্ত্রণা
আবার যুদ্ধ
(ফিরে চলা এক নদী/ঘরহীনের কাব্য)
২.
কাশ্মীরী শিশুর কান্নায় যখন ঝিলামের পানি প্রশস্ত হয়
বিপন্ন নারীর চিৎকারে যখন কাঁপতে থাকে ভূ-স্বর্গ
তখনও সাড়া তোলে না
পুঁজির পাহাড় আঁকড়ে পড়ে আছে ভোগবাদী বিশ্বাসীরা
(ফিরে চলা এক নদী/আলোকিত অতীত)
৩.
আজ ষাট হাজার বসনীয় নারী
বর্বর সার্ব দস্যুর সন্তান ধারনে বাধ্য হয়েছে
এ লজ্জা আমি রাখবো কোথায়?
(ফিরে চলা এক নদী/গ্লানির উপত্যকা)
৪.
ওরা কি কোন বোনের ভাই নয়, যারা সীমার মৃত্যুকে ডেকে আনে
পশুদের অত্যাচারে কত মেয়েই না সীমা হচ্ছে, ইয়াসমীন-শবমেহের হচ্ছে
নারীর চোখের লবনে বিষাক্ত হচ্ছে জনপদ- ভারী হচ্ছে পৃথিবীর বুক।
যেখানে ফুলের বিপনী আছে, সুগন্ধি কিনে নেয় মানুষ
সেখানে নারী কিভাবে লাঞ্ছিত হয়।
(ফিরে চলা এক নদী/খুনীরা)
এমনি আরো অনেক কবিতায় ও গানে নিষ্পেষিত মানবতার দগ্ধ শরীর দেখে শিউরে ওঠা কবির প্রাণ কেঁদে ওঠেছে। কবির অন্তরাত্মার পবিত্রতা, যেখান থেকে উৎসারিত চিন্তনমালা প্রেমময় এক মানবসমাজ অবলোকন করতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক। সঙ্গত কারণেই কবি মৃত্যুর পরের জীবনে জবাবদিহির ভয়ে শংকিত। এই শংকা তাকে করে তুলেছে মানবপ্রেমিক ক্ষমাশীল, অনুভূতিপ্রবণ, ত্যাগি এবং মানবতার সুবিচারক।
তাঁকে বিশ্বাসী বলাটা সংগত নয়। কারণ পৃথিবীতে সবাই বিশ্বাসী। কেউ বিশ্বাস করেন অবারিত স্বাধীনতায় ভোগ করো, কোনো কৈফিয়ত কাউকে দিতে হবে না, কেউ বিশ্বাস করে বিশেষ কিছু ব্যক্তির সনদে সব কলুষতা পাপ পঙ্কিলতার উর্ধে উঠে যাবে তারা। কেউ বিশ্বাস করে পৃথিবীর সব জঞ্জাল, সবকিছু থেকে নিজেকে বাচিয়ে চলো, পৃথিবী আবর্জনার স্তুপে পরিনত হোক, তাতে কিবা যায় আসে, নিজে পার পেলেই রক্ষে। আমাদের কবি গোলাম মোহাম্মদ এসব বিশ্বাসে বিশ্বাসী নন। তিনি সহসী বীর যোদ্ধার মতো উচ্চকণ্ঠ এক পুরুষ।
সাধারণ মানুষ তার অবসরে যখন চেতনকে উন্মুক্ত করে তখন তার হৃদয় হয়ে যায় প্রেক্ষাগৃহের রূপালী পর্দা। সে দেখে, গ্রামের সবুজ বৃক্ষ, লতা, নদী, শীষভরা ক্ষেত, লতায় জড়ানো কলাপাতার বেড়া অথবা শহরের রাস্তায় কোনো ভিখারীর করুণ মুখের ভাষা অথবা নিকট অতীতে হারিয়ে যাওয়া স্বজন অথবা পিতার মৃত্যু, মায়ের ধোঁয়া মাখা রান্না। এরকম বিষয়গুলোকে অক্ষরের পর অক্ষর সাজিয়ে শব্দের গাঁথুনীতে কাগজের পৃষ্ঠায় একটা একটা করে অভূতপূর্ব অবয়ব আঁকেন কবি। এখানেই সাধারণ মানুষ থেকে কবির পার্থক্য। সেই সাধারণ মানুষ যখন কবিতা পড়ে, তখন তার চিন্তার বাজার থেকে বেসাতি কিনে থলি ভরে রাখে চিন্তনের পাত্রে। তার হৃদয়ের তারগুলো ঝংকার তোলে, চিন্তার ক্ষেত্রে কর্ষণ শুরু হয়। গুণিরা ফসল ফলান, তারা সংস্কৃতিবান হয়ে ওঠেন। নির্গুনেরাও ব্যর্থ হন না, পাথর সরতে সরতে এক সময় মাটির ক্ষেত হয়তো বের হয়ে আসে। তাই কবিতা আমাদের প্রয়োজন। সাধারণ মানুষকে কবিতা মুখী করে তোলা প্রয়োজন। মানুষের কাছে কবিতাকে পৌঁছানো দরকার, হয়তো পাথরেও একদিন ফুটবে ফুল। কবি গোলাম মোহাম্মদের কিছু কবিতায় সে বীজও লুকিয়ে আছে
১. ঘুম ভেঙ্গে যায় গানে অদৃশ্যের চিল
২. নির্বাক চলে যাবার কথা ফিরে চলা এক নদী
৩. অধিকার হিজল বনের পাখি
৪. তারা মিয়া
৫. হারানো সংবাদ
৬. বঞ্চনার দৃশ্যকাব্য ঘাসফুল বেদনা
৭. কাক ও বিক্ষোভ
৮. কেন এত কষ্ট কেন এত সুখ হে সুদূর হে নৈকট্য
কবির সকল কবিতা ও গানের পরিচয় দেয়া প্রবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। অন্যদিকে কবি যে একজন কবি এই সার্টিফিকেটের উপরও তাঁর কবিত্ব নির্ভর করে না। তিনি পাঠকের কাছে কবি এটাই তার কবিত্বের মাপকাঠি। তিনি কবিতা লিখতে গিয়ে অলংকার, অনুপ্রাস, ব্যঞ্জনা, উপমা কোথায় কিভাবে ব্যবহার করেছেন, তার কবিতার ছন্দের ভেদ, ব্যকরণ কি, বিধি-নিষেধ কতোটুকু মেনেছেন এসব নির্ণয় আমার কর্ম নয়। পন্ডিত, বিশেষজ্ঞদের কাজ সেটা। সাধারণ পাঠক হিসেবে কবির কাছে আমার অধিকার, তাঁর কবিতায় আমি উদ্দীপ্ত হবো, আমার হৃদয় হবে আলোকিত তিনি আমার চেতনার দরজায় করাঘাত করবেন এ আমার অধিকার। আর আমার এ নিবন্ধ তারই প্রকাশ। খুবই অল্প সময় পেয়েছেন কবি গোলাম মোহাম্মদ। এরই মধ্যে তার দৃষ্টি গেছে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। কবিতায় অপ্রচলিত অনেক আধুনিক শব্দ তিনি ব্যবহার করেছেন। যা খুব বেশি অগ্রসর মনের পরিচায়ক। ধারণা করি আগামী এক যুগ পরে কবিতায় যে শব্দ ব্যবহার হবে তিনি অনেক আগেই তার কবিতায় সে সব শব্দের ছান্দিক ব্যবহার করেছেন। ২০০২ সালে প্রকাশিত ‘হে সুদূর হে নৈকট্য’ কাব্যগ্রন্থের অনেক কবিতায় কবি নিজের যন্ত্রণা ব্যক্ত করেছেন। কবিকে চেনার পরে এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো অন্তরে অশ্রু ঝরায়।
১.
ঘুমভরা রাত ছিলো আলোভরা দিন
এখন সে সব যেনো সুদূরের স্মৃতি
ঘুমের বড়ির খোঁজ শিখেছে মানুষ
কৃত্রিম বাঁচার জ্বালা শরীরে ভীষণ
/মাতাল নগর
২.
শুনেছি আপোস ছাড়া কবিরা বাঁচতে পারেনা
আমি আর কতো আপোস করবো
/কবিরা
৩.
হে ঘুম জড়তা অবসাদ
তোমরা আমাকে নিষ্কৃতি দাও।
…………………………………
তোমাদের সাথে তো আছি বিয়াল্লিশ বছর
ঘুমে অলসতায় অসতর্ক চেতনাহীন।
/হে ঘুম
৪.
আমি কোনো আবাস গড়তে পারি নাই
এখন মনে হয় ঘর মানুষকে কতোটা আশ্রয় দিতে পারে?
ছেলে মেয়েদের কোথায় রেখে যাবেন, তারো কোনো উত্তর
আমি জানি না, স্পর্ধা করে বলি ওটা আমার কাজ নয়।
বিয়াল্লিশ বছর বয়সেই কবি জীবন থেকে নিষ্কৃতি চেয়েছেন। ‘হে ঘুম জড়তা অবসাদ তোমরা আমাকে নিষ্কৃতি দাও। … … … তোমাদের সাথে তো আছি বিয়াল্লিশ বছর।’ তেতাল্লিশ বছরে কবি নিষ্কৃতি পেয়েছেন। কি এমন যন্ত্রণা! অভাব! ‘ ছেলে মেয়েদের কোথায় রেখে যাবেন’ অথবা ‘আমি আর কতো আপোস করবো।’ এসব পঙক্তিগুলো যে চিত্র তুলে ধরে তাতে তাই মনে হয়। এরপর কবি তিল তিল করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে গেছেন। তিনি হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন চলে যেতে হবে, বেশ কিছু কবিতায় তা স্পষ্ট উঠে এসেছে।
১.
মৃত্যুর সাথে কাল একজন কবির বাসায় দেখা
পায়ে পায়ে হাঁটতে হাঁটতে আলিঙ্গন তার
এই ভাবেই মৃত্যুরা আমাদের পিছে পিছে হাঁটছে
/মৃত্যুর সাথে
২.
মৃত্যুর মোহন বাঁশি জ্বলতে জ্বলতে কবিতার
গণিতের মধ্যে মিশে গেলেন
জীবনের পরম সত্য কবির চিরকালের জানা
/রসনায় রুই মৃগেল
৩.
এখন আমি একা থাকতে পারি
একা একা বসে গুনতে পারি সময়ের সবগুলো পদশব্দ
মানুষেরা যে আসলেই একা
একা আসে একা যায়
/একা
৪.
হে আমার প্রেম! আশ্রয় ও অবকাশ
চোখ বুজলেই থেমে যায় আলোর প্রিজম
দিন রাত, রাত দিন সমতল অবসর যেনো শিল্পখন্ড
কবি গোলাম মোহাম্মদ চিরঅবসরে চলে গেছেন। সুন্দরের সাধনায় তিনি যে সত্যের সন্ধান পেয়েছেন তার কবিতা গানে, প্রবন্ধে ও শিল্পকর্মে তা উদ্ভাসিত। এটি কোনো সমালোচনা বা আলোচনাও নয়। সমালোচনা আলোচনার উৎপত্তিস্থল হচ্ছে মস্তিস্ক। যেখানে যুক্তি কাজ করে। যদিও কবিত্ব বিষয়টি যুক্তি নির্ভর নয়, আত্মা নির্ভর। যদিও যুক্তি নির্ভর কবিতা আছে, কবিত্ব আছে। তাতে মানবতার সাক্ষাৎ যদিও মেলে তা হৃদয়স্পর্শ করে কম। আত্মানির্ভর কবিতাই মানবত্মার কল্যাণের কথা বলে, এখানে যুক্তি, দর্শন, বিজ্ঞান পরাভুত। এখানে জয়ী শুধুই মানবতা। গোলাম মোহাম্মদ মানবতার কবি।
