বীভৎসতার দৃশ্যায়ন এবং দর্শকের মনোজগৎ

সমাজ যে প্রতিনিয়ত বদলায় – এটা আমরা মোটামুটি জানি। কিন্তু প্রশ্ন হলো আমাদের সমাজের ক্ষেত্রে সেই পরিবর্তনটা ইতিবাচক না কি নেতিবাচক?

একটা প্রত্যক্ষ উদাহরণ দিয়ে আলোচনাটা শুরু করা যাক। আগের প্রজন্ম হলে গিয়ে সিনেমা দেখতো, টিভিতে নাটক দেখতো। এখন শুরু হয়েছে ল্যাপটপে ওয়েব সিরিজ। সুতরাং এন্টারটেইনমেন্ট ইন্ডাস্ট্রির আয়ের উৎস বদলে গেছে। কিন্তু মূল সমস্যা সেটা নয়। মূল বিষয় হলো দর্শকের রুচিবোধ।

একটা সময় দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় সিনেমাগুলো ছিলো মূলত প্রেমের গল্প। সেই অবস্থাটা এখন আর নেই। উত্তম সুচিত্রা যুগ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। ওয়েব সিরিজে মিষ্টি প্রেমের গল্প দেখতে দর্শক আগ্রহী নয়। এখনকার দর্শকের চাই টানটান উত্তেজনা।

সুতরাং এদেশের সমাজব্যবস্থা যে বদলে যাচ্ছে সেটা টের পাওয়া যায়। কিন্তু সেই পরিবর্তনটা ভালো না কি খারাপ। সেটা আমরা সবসময় ঠাহর করতে পারি না। এই বিভ্রান্তি স্বাভাবিক। কারণ এই পরিবর্তিত অবস্থাটা আমাদের জন্য নতুন। তাই বর্তমান সময়ের পরিবর্তনগুলো ভালো না খারাপ তা বুঝতে আমাদের সময় লাগে।

এই যে দর্শকের রুচিবোধের পরিবর্তন – এটা কিন্তু খুব তুচ্ছ বিষয় নয়। মানুষ কিসে আনন্দ পায় – সেটা বিশ্লেষণ করলে তার মানসিক কাঠামো সম্পর্কে খানিকটা ধারনা পাওয়া যায়।

বিনোদন শিল্পের এই পরিবর্তন শুধুমাত্র নিছক ডিম্যান্ড এন্ড সাপ্লাইয়ের ব্যাপার নয়। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে নিয়ন্ত্রণ। আগে নাটক সিনেমায় সেন্সরের একটা ব্যাপার ছিলো। বীভৎস দৃশ্য বা খোলামেলা যৌনতার দৃশ্যায়নে কিছুটা নিষেধাজ্ঞা ছিলো। এখনকার ওয়েব সিরিজের জগতটা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণহীন। ফলে সেখানে বীভৎসতা আছে, যৌনতার খোলামেলা উপস্থাপন আছে।

এর কারনটাও স্পষ্ট। মানুষের মনের মধ্যে একটা গভীর অন্ধকার জগৎ লুকানো থাকে। বীভৎসতা বা যৌনতার দৃশ্যায়নে সেই অন্ধকার প্রবৃত্তিটাকে উসকে দেওয়া হয়। ওয়েব সিরিজের ক্ষেত্রে এই উসকে দেওয়ার উদ্দেশ্যটা বাণিজ্যিক। বেশি সংখ্যক দর্শককে টেনে রাখতে হবে। তা না হলে নির্মাণ খরচ তুলে আনা যাবে না। এগুলো সবই জনপ্রিয় হওয়ার সস্তা কৌশল।

শেষ পর্যন্ত তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়ালো? বিনোদন শিল্পের এই পরিবর্তনকে কি আমরা ইতিবাচক বলবো? হ্যাঁ, ইতিবাচক দিক আছে অবশ্যই। দর্শকের ম্যাচিউরিটি আগের চেয়ে অনেকটা বেড়েছে। সাবটাইটেলের কল্যানে কোরিয়ান, সাউথ ইন্ডিয়ান বা জাপানি সিনেমাও এখন উপভোগ করা সহজ। আগে এই সুযোগ ততটা ছিলো না।

এই যে দর্শকেরা বিভিন্ন ভাষা আর সংস্কৃতির সিনেমা দেখার সুযোগ পাচ্ছে সেটা অবশ্যই ভালো। বৈচিত্র্যই মানুষের মনকে প্রসারিত করে। একমুখী দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে তৈরি হয় বহুমুখী চিন্তার সমন্বয়। দর্শককে পরিপক্ক করে তোলার ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব আছে অবশ্যই। এই ইতিবাচক পরিবর্তনকে স্বাগত জানানো অবশ্যই আমাদের কর্তব্য।

কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন ওয়েব সিরিজ যে বীভৎসতার উপস্থাপন করে চলেছে এর পরিণতি কী?

বীভৎস হত্যা দৃশ্যের পৌনঃপুনিক চিত্রায়ণ মানুষের মনে একটা প্রভাব ফেলে তো বটেই। ভয়াবহ নিষ্ঠুরতাকে তখন আর অস্বাভাবিক মনে হয় না। এটা কিন্তু একটা ভয়াবহ বিপর্যয়।

প্রত্যেক দর্শক এই সমাজেরই একজন মানুষ। নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিলে সমাজে নিষ্ঠুরতার এক ধরনের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয় । তার প্রমাণও আমরা দেখতে পাচ্ছি। বীভৎস হত্যাকাণ্ডের খবর পাচ্ছি প্রতিদিন। হত্যার পর টুকরো টুকরো করা লাশের ছবি দেখতে পাই আমরা। পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে দেওয়া হয় জীবন্ত মানুষ।

সমাজে কিশোর অপরাধীদের উপদ্রব বেড়েছে। নৃশংস হত্যাকাণ্ডে অংশ নিচ্ছে কিশোর অপরাধীরা। কতই বা বয়স এদের? এদের বেশিরভাগই এখনো টিনএজ বয়স পার হয়নি।

আমরা বুঝতে পারি, এসব ভিডিও কন্টেন্টের দর্শকদের একটা বড় অংশ তরুন, টিনএজ বয়সের। নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের দৃশ্য এই তরুনরা প্রতিনিয়ত ল্যাপটপ কিংবা মুঠোফোনের স্ক্রিনে দেখে। এই নিষ্ঠুরতা, এই রক্তপাত তাদের কাছে অপরিচিত নয়; বরং নিষ্ঠুর হওয়াটা নায়কোচিত বীরত্বের লক্ষ্মণ। মূল সমস্যাটা এখানেই। স্নেহ মমতা বা ভালোবাসার মতো মানবিক অনুভূতির পরিবর্তে এই নিষ্ঠুরতাকে আদর্শায়িত করা হয়েছে। খুব নীরবে দর্শককে বার্তা দেওয়া হচ্ছে – এই বীভৎসতা, এই রক্তপাত এগুলো অন্যায় নয়, এগুলো অস্বাভাবিক নয়। দর্শক অবচেতন মনে জেনে নিচ্ছে-এই রক্তাক্ত বীভৎসতা জীবনের স্বাভাবিক অংশ।

মানুষের অবচেতন মনের এ এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য। স্ক্রিনে সে বারবার যা দেখে, একটা পর্যায়ে সে সেটাকেই গ্রহণ করতে শুরু করে। একটা সময়ে সিনেমা আর বাস্তবতার পার্থক্য করা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।

দর্শকের মনজগতের এই যে পরিবর্তন – এ এক ভয়ংকর বিপর্যয়। এক অর্থে, এ আসলে মানুষের মূল্যবোধের পরিবর্তন। হত্যা, রক্তপাত – এগুলোকে সে আর অন্যায় বলে মনে করে না। কোন বীভৎসতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাটা সে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে না, এর প্রতিকারের জন্য উদ্যোগী হয় না। কারণ অবচেতন মনে এই নিষ্ঠুরতাকেই সে স্বাভাবিক বলে গ্রহণ করে নিয়েছে।

কিন্তু দর্শকরা এই বীভৎসতা আগ্রহ করে দেখছে কেন? কারণ রুচিবোধের অভাব। এই বীভৎসতাকে প্রত্যাখ্যান করার মতো বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা তার নেই। বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা একদিনে গড়ে ওঠে না। এদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এবং শিল্প সাহিত্যের পরিবেশ সেরকম দর্শক নির্মান করতে পারেনি।

তবে বীভৎসতার দৃশ্যায়নের জন্য একতরফা শুধু ওয়েব সিরিজই দায়ী নয়। পনেরো বিশ বছর আগেও ঢাকা কেন্দ্রিক বাংলা সিনেমায় এসব নারকীয় হত্যাযজ্ঞ দেখানো হয়েছে। ঢাকার বাণিজ্যিক সিনেমার দর্শকদের মধ্যে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উপস্থিতি নিতান্ত কম বলে সম্ভবত সে সময় আমরা এ বিষয়ে সচেতন হইনি।

নাটক বা সিনেমায় অপরাধের দৃশ্যায়ন কিন্তু আগেও ছিলো। গোয়েন্দা গল্প বা থ্রিলার ধাঁচের নাটক সিনেমার গল্পে অপরাধ তো থাকেই। কিন্তু এই বীভৎসতা আগে ছিলো না। বীভৎস দৃশ্য সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হতো।

এখন তাহলে সমাধানের পথটা কী?

অনেকেই ওয়েব সিরিজের উপর সেন্সরশিপ আরোপ করতে চান। কিন্তু আমরা বুঝতে পারি এই ইন্টারনেটের যুগে এ কৌশল কার্যকর হবেনা । বিদেশি ওয়েব সিরিজের নির্মাতারা এই ধরনের সেন্সরশিপের তোয়াক্কা করে না। ভিডিও ডাউনলোডের অসংখ্য কৌশল আমাদের তরুণদের জানা আছে।

আমার বিশ্বাস, এর সবচেয়ে ভালো সমাধান দর্শকের প্রত্যাখ্যান। দর্শকেরা এই ধরনের ভিডিও কন্টেন্ট প্রত্যাখ্যান করলেই এর একটা সুরাহা হয়ে যেতো। কিন্তু সেটি এত সহজে সম্ভব নয়। কারণ আগেই বলেছি – মানুষের তার মনের মধ্যে একটা গভীর অন্ধকার জগৎকে লালন করে। সেই অন্ধকার প্রবনতাকে উসকে দিলে মানুষ এক পর্যায়ে দানব হয়ে ওঠার আশংকা তৈরি হয়। তাই ভিডিও কন্টেন্ট এর বীভৎসতাকে প্রত্যাখান করার প্রবণতা দর্শকদের মধ্যে এত সহজে তৈরি হবে না – এটাই স্বাভাবিক।

এই সমস্যার আরেকটি সমাধান আছে। সেটি হচ্ছে সমাজে সুস্থ বিনোদনের সুযোগ বাড়ানো। সেই জরুরী কাজটি বহু বছর ধরে করা হয়নি। তার চূড়ান্ত পরিণতি এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি।

আমাদের নাটক সিনেমার পরিচালকেরা তাদের দর্শকদের বিনোদনের উপকরণ যোগান দিতে পারেননি। এই ব্যর্থতার সমাধান এখন তাদেরকেই খুঁজে বের করতে হবে। নাটক, সিনেমা বা ওয়েব সিরিজে হত্যা আর বীভৎসতার পরিবর্তে মানবিক অনুভূতির প্রকাশ ঘটাতে হবে।

দায়িত্ব দর্শকদেরও আছে। নিজের মনের অন্ধকার জগতটাকে উসকে দিলে শেষ পর্যন্ত তার নিজেরই ক্ষতি – এই বোধ দর্শকের মধ্যে তৈরি হওয়াটা খুব দরকার। তবে অনেক দর্শকের ক্ষেত্রেই এই রুচি বোধ হয়তো এমনি এমনি তৈরি হবে না। সে জন্য দরকার সামষ্টিক উদ্যোগ; দরকার সমাজের সচেতন মানুষদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। সেখানে মিডিয়ার ভূমিকা আছে, লেখক বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা আছে। মানুষের রুচিবোধের নির্মাণ একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া; রাতারাতি তো হবার নয়।

এই সমস্যা একদিনে তৈরি হয়নি। সমাধান ও এত সহজে হবে না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top