এক) হোয়াটসঅ্যাপ ওপেন করতেই চোখ কপালে উঠলো মাহিনের। চ্যাটলিস্টের সর্বপ্রথম নামটা পড়ে হতবাক হয়ে চেয়ে রইলো সে। খানিকক্ষণ পর বুঝলো এটা কারো ব্যক্তিগত আইডি নয়, একটা গ্রুপ। ‘তুমি আমি রাজাকার’ নামের গ্রুপটাতে ক্লিক করতেই বিস্ময়টা বিরক্তিতে পরিণত হলো। যা ভেবেছিলো ঠিক তাই। ফারাবীর কাজ এটা। কতবার ওকে নিষেধ করেছে যেন কোনো অপরিচিত/অপ্রয়োজনীয় গ্রুপে হুটহাট তাকে এড না করে বসে। কে শোনে কার কথা। গ্রুপে আদান প্রদান হওয়া কয়েকটি মেসেজ পড়তেই গা শিউরে উঠলো মাহিনের। দ্রুত লিভ নিলো গ্রুপ থেকে। সময়টা ভালো না। কোটা সংস্কারের দাবিতে ঢাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন যে দ্রুতই অন্যান্য পাবলিক ভার্সিটিগুলোতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে তা আগেই অনুমান করতে পেরেছিলো মাহিন। বিশেষ করে গতকাল ঢাবিতে সরকারি দলের ছাত্রসংগঠনের হামলার পর। কিন্তু তাদের ক্যাম্পাসও যে এত দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠবে তা তার ধারণারও বাইরে ছিলো। ঢাকার স্বনামধন্য একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে মাহিন। পোস্ট গ্রাজুয়েশন শেষে পিএইচডির উদ্দেশ্যে জার্মানিতে পাড়ি জমাবে- আপাতত এমনই পরিকল্পনা। তার ধারণা ছিল শুধু সে একা নয় সহপাঠীদের কমবেশি সবাই ভবিষ্যতে বিদেশে থিতু হবার স্বপ্ন দেখে। অথচ তারাই কিনা আজ ‘কোটা সংস্কার চাই’ স্লোগান তুলে রাজপথে নামতে চাইছে! কিন্তু কেন? ভাবতে গিয়ে গোটা বিষয়টা ভীষণ ‘উইয়ার্ড’ লাগে মাহিনের। হঠাৎ ফোনের রিংটোনে ভাবনায় ছেদ পড়ে তার। ফারাবীর ফোন।
‘কিরে গ্রুপ থেকে লিভ নিলি কেন?’ -কল রিসিভ করতেই ওপ্রান্ত থেকে উত্তেজিত কণ্ঠ শোনা যায় ফারাবীর।
‘তুই ভাবতে পারতেছিস এসব গ্রুপে এড হওয়া কতটা রিস্কি? তুইও লিভ নে এখনই।’ বিরক্তি নিয়ে বলে মাহিন।
‘নো ওয়ে, ব্রো। আমারতো কালকের প্রসেশনে যাওয়ার জন্য অলমোস্ট সব প্রিপারেশন শেষ। আর তুই বলতেছিস গ্রুপ থেকে লিভ নিতে!’ কণ্ঠে বিস্ময় ফারাবীর।
‘আমি তোকে ওয়ার্ন করতেছি ফারাবী। এসবের মধ্যে ইনভলভ হোস না। ঝামেলায় পড়বি। আরে একটা সিম্পল বিষয়তো বুঝতে ট্রাই কর- আমাদের প্ল্যান ছিলো দেশে পড়া শেষ করে বাইরে চলে যাবো। এদেশের সরকারি চাকরিতে কোটা থাকলো কি না থাকলো, ইটস নান অফ আওয়ার বিজনেস, রাইট?’ একনাগাড়ে কথাগুলো বলে শেষ করে মাহিন।
‘আমাদের লড়াইটা শুধু কোটার জন্য না, মাহিন। কালকে ডি.ইউ. এর স্টুডেন্টদের ওপর যেভাবে হামলা হলো, ইভেন মেয়েদের ওপরও। এরপর অন্তত ওদের সাপোর্ট দিতেও যদি ভয় পাই তাহলে…’ কথা শেষ করতে পারেনা ফারাবী।
‘যা ভাল মনে হয় কর। কিন্তু আমাকে এসবের মধ্যে জড়াস না, প্লিজ।’ সংক্ষেপে জবাব দেয় মাহিন।
‘একটা সুন্দর উক্তি আছে জানিস- আমিও মানুষ,তুমিও মানুষ,তফাত শুধু শিরদাঁড়ায়। যাই হোক,আমি রাখি।’ স্বগতোক্তির মত কথাগুলো শেষ হতেই লাইন কেটে দেয় ফারাবী। কিছু বলার সুযোগ পায়না মাহিন।কেবল ফারাবীর বলা উক্তিটা কানে বাজতে থাকে তার।
দুই) ফোনের স্ক্রিনের দিকে সম্মোহিতের মতো তাকিয়ে আছে মাহিন। স্ক্রিনজুড়ে শুধু লাল। সেই লালিমা যেন ধীরে ধীরে গ্রাস করে নিতে চায় তাকে। হঠাৎ সে উপলব্ধি করে ফোনের স্ক্রিন পেরিয়ে, তার ঘর অতিক্রম করে, দেশের প্রতিটি অলিগলি আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে রক্তিম আভায়। মুগ্ধরা ছুটে বেড়াচ্ছে পানি হাতে, কিন্তু মুছে দিতে পারছেনা এই লালিমা । এবার ওরা মিছিল নিয়ে ছুটে আসছে এদিকে। আবু সাঈদ পথ দেখাচ্ছে ওদের। ওদের সাথে আছে ইয়ামিন, প্রিজন ভ্যান থেকে ছুড়ে ফেলা হয়েছিল ওর লাশ। আছে নাফিজও, চলন্ত রিকশার পাদানিতে পড়েছিল ও । মিছিলের সামনের সারিতে একটি মুখ খুব চেনা লাগে মাহিনের। এটা ফারাবী। কাছে এগোতেই মাহিন শুনতে পায় স্লোগান নয়, সমস্বরে ধিক্কার দিতে দিতে এগিয়ে আসছে ওরা -‘তুমিও মানুষ, আমিও মানুষ, তফাত শুধু শিরদাঁড়ায়…’। ওদের চিৎকার সহ্য করতে না পেরে দৌড় দিতে চেষ্টা করে মাহিন। কিন্তু মুখ থুবড়ে পড়ে। ঘুম ভেঙে যায় মাহিনের। জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকে সে। গত কয়েকদিনে যতবার ফেসবুকে ঢুকেছে, দম বন্ধ হয়ে এসেছে তার। নিউজফিড জুড়ে শুধু মৃত্যু আর বীভৎসতা। এর মধ্যেই আজ সকালে হঠাৎ সে আবিষ্কার করেছে ফারাবীসহ ফ্রেন্ডলিস্টের বেশ কয়েকজনের প্রোফাইল একদম লাল। তারও ইচ্ছে হয় নিজের প্রোফাইলটা লাল করে দিতে। এডিট প্রোফাইলে গিয়ে লাল রঙের ছবিটা সিলেক্টও করেছিলো সে। কিন্তু সেভ অপশনে ক্লিক করার ঠিক আগ মুহুর্তে একরাশ দ্বিধা ঘিরে ধরে তাকে। যদি সামান্য এই চিহ্নটুকুও তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়? সেভ অপশনে ক্লিক করবে নাকি করবে না ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল নিজেও জানেনা সে। বেশ কিছুক্ষণ হয়ে গেছে ঘুম ভেঙেছে তার। শ্বাস-প্রশ্বাসও স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। হঠাৎ তার মনে হয় সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলেছে সে। চট করে ফোনটা অন করে সে। স্ক্রিনে ভেসে ওঠে সেই লাল প্রোফাইল। নিচে দুটি অপশন। কিছু না ভেবেই সেভ অপশনে ক্লিক করে সে। কিন্তু একি! সেভ হচ্ছেনা ছবিটা। ইন্টারনেট কানেকশন পরীক্ষা করার বার্তা ভেসে উঠছে বারবার।
বেশ কয়েকবার চেষ্টার পর অবশেষে মাহিন ধরতে পারে আসল সমস্যাটা-আবারো ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট! ফোনটা বিছানার উপর ছুড়ে ফেলে সে। কি করবে ভেবে না পেয়ে ভীষণ অস্থির লাগে তার। কারফিউ এর তৃতীয় দিন আজ। বাইরে যাবার প্রশ্নই ওঠেনা। ছাদ থেকে হেঁটে আসা যায় খানিকক্ষণ -ভাবনাটা মাথায় আসতে না আসতেই চলে যায়। কারণ ছাদেও গুলিবিদ্ধ হবার সম্ভাবনা আছে। মাহিনদের এলাকায় ইদানীং হেলিকপ্টারের আনাগোনা ভীষণ বেড়ে গেছে। মৃত্যুর ভয় যাকে তাড়া করে বেড়ায় সে বোধ হয় পাতালে লুকিয়েও স্বস্তি পায়না, ভাবে মাহিন। নিজেকে কাপুরষ মনে হয় তার। ঠিক এই মুহুর্তে ফারাবীকে খুব মনে পড়ে। কারফিউ, বুলেট – কোনকিছুরই ধার ধারেনা ছেলেটা। সেই শুরুর দিন থেকে মৃত্যুকে পাশে নিয়ে একের পর এক মিছিলে অবিরাম হেঁটে চলেছে সে। মিছিল! -শব্দটা অনেকটা বুলেটের মত হঠাৎ এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয় মাহিনের ভাবনাটাকে। বিকেলের দু:স্বপ্নটার কথা মনে পড়ে যায় তৎক্ষনাৎ। মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করে ওঠে তার। আজ সারাদিনে একবারও কথা হয়নি ফারাবীর সাথে। দ্রুত ফোনটা হাতে নেয় মাহিন ফোন করে ফারাবীকে। প্রথমবার রিসিভ হয়না। দ্বিতীয়বারেও না। এমনকি তৃতীয়বারেও না। চতুর্থবার কল করেনা সে। বোঝার চেষ্টা করে বিষয়টা। চার্জ ফুরিয়ে গিয়ে থাকলে ফোনটা সুইচড অফ থাকতো। আর তাছাড়া এতক্ষণে প্রসেশন শেষ হয়ে যাবার কথা। ফারাবীর সাথে নিয়মিত মিছিলে যেত ক্যাম্পাসের এমন কয়েকজন পরিচিত ছেলেকে একে একে ফোন করে মাহিন। শুরুর দিকে সবাই একসাথে থাকলেও পুলিশের হামলার পর একে অন্যের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় কেউই ফারাবীর ব্যাপারে সঠিকভাবে বলতে পারেনা। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করে মাহিনের। ফারাবীর বাসায় ফোন করতে গিয়েও করেনা সে। ব্লক রেইড শুরু হবার পর থেকে ফারাবী যে রাতে বাড়িতে ফেরেনা তা ভালো করেই জানে সে। উপায়ন্তর না দেখে আবার ফারাবীর ফোনেই ফোন করে সে। এবারে কলটা রিসিভ হয়।
‘হ্যালো, ফারাবী? আর ইউ ওকে?’ ওপ্রান্ত থেকে কিছু বলার আগেই দ্রুত জিজ্ঞাসা করে মাহিন।
‘আপনি ওনার বাড়ির লোক?’ মাহিনকে অবাক করে দিয়ে একটি অপরিচিত নারীকণ্ঠ বেজে ওঠে ফোনে।
‘হ্যালো? আপনি কে বলছেন? ফারাবী কোথায়?’ চিৎকার করতে গিয়েও কণ্ঠটা কেঁপে যায় মাহিনের।
‘আমি সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলের ইমার্জেন্সি থেকে বলছি। একটু আগেই আমাদের এখানে একটা ডেডবডি আনা হয়েছে।ওনার পকেটেই ফোনটা পেয়েছি। সম্ভবত ইনিই ফারাবী। আপনি প্লিজ ওনার বাড়ির লোককে সঙ্গে নিয়ে দ্রুত চলে আসুন।’ দ্রুত কথাগুলো বলে নারীকণ্ঠটি।
মাহিনের কণ্ঠটা যেন জোরে চেপে ধরে কেউ। ভারি হয়ে আসা কণ্ঠটা আর স্বাভাবিক করতে পারেনা সে। ‘ইউ মিন টু সে, ফারাবী…’ অস্ফুট স্বরে উচ্চারণ করে সে।
‘ইয়েস। হি ইজ ডেড। আপনারা প্লিজ দেরি করবেন না। গানশট উন্ড যেহেতু,বেশি দেরি হলে আপনাদেরও পুলিশি ঝামেলায় পড়তে হবে, আমাদেরও অনেক ট্রাবল ফেস করতে হবে। হারি আপ, প্লিজ।’ কথাগুলো শেষ হতেই লাইনটা কেটে যায়। অথবা কাটেনা। আরো কিছু কথা হয়তো ভেসে আসে ওপ্রান্ত থেকে। কিন্তু সেগুলো শোনার আগেই এক অপার্থিব নৈ:শব্দের মাঝে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়ে পড়ে মাহিন ।
তিন) আষাঢ় মাসের ভ্যাপসা গরম এই প্রথম এত উপভোগ করছে মাহিন। কারণ সে জানে এই গরমটা যত লম্বা সময়ই হোক, এরপর অবশ্যই বৃষ্টি নামবে। ঝুম বৃষ্টি। বন্যাও নিশ্চয়ই হবে। হতেই হবে। বৃষ্টিতে না হোক, রক্তে হবে। নাহলে সমস্ত অন্যায় ভেসে যাবে কি করে? ‘রক্তের বন্যায়, ভেসে যাবে অন্যায়’- গলার সবটুকু জোর দিয়ে স্লোগান দেয় মাহিন। সে এখন হাঁটছে মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের নিচের সড়ক ধরে। মাথায় বাঁধা জাতীয় পতাকার প্রান্ত থেকে চশমার কাঁচের উপর চুঁইয়ে পড়া ঘামের বিন্দুগুলো বারবার হাত দিয়ে মুছতে হচ্ছে তাকে। সম্ভবত সেটা লক্ষ্য করেই পাশাপাশি হাঁটতে থাকা তরুণটি টিস্যু এগিয়ে দিলো তার দিকে। তরুণটিকে ধন্যবাদ দিলো মাহিন। কিন্তু হাজারো মানুষের স্লোগানের আওয়াজের নিচে চাপা পড়ে গেলো তার গলার স্বর।
‘একটু রেস্ট নেবেন ভাই? আপনাকে অনেক টায়ার্ড লাগতেছে।’ গলার স্বর খানিকটা চড়িয়ে জিজ্ঞাসা করে তরুণটি। ‘ভাই!’- শব্দটা শুনে অদ্ভুত এক অনুভূতি হয় মাহিনের। আচ্ছা এই ছেলেটি কি পাবলিক ভার্সিটির? ছেলেটিও কি তার মত আজ প্রথমবার এতটা পথ পায়ে হাঁটছে? নাকি জন্মের সময় হতেই শিরদাঁড়া মজবুত ওর? ফারাবীর মত…? কি যায় আসে তাতে। শুধু এই তরুণটি নয়, আজ এই মিছিলে যারা এসেছে তারা সকলেই যেন ভাই। এটাই তো একমাত্র পরিচয়, মনে হতে থাকে মাহিনের।
‘রেস্ট নিতে চান একটু?’ প্রথমবার উত্তর না পেয়ে আবার প্রশ্ন করে তরুণটি।
‘না, ভাই। চলুন সামনে যাই।’ সম্বিৎ ফিরে পেয়ে বলে ওঠে মাহিন।
এখানে থামলে তো চলবেনা। যত ক্লান্তিই আসুক, সামনে এগোতে হবে ! ফারাবীর অসমাপ্ত জুলাইয়ের শেষটা তাকে দেখতেই হবে। পথটা শেষ হতে আর বোধহয় বেশি বাকি নেই, মনে হতে থাকে মাহিনের।
