আষাঢ়ের আড্ডায় ‘নারীবাদ’ 

বিকেল ৫ টা । বৈঠকি ঢং এ সাজানো চেয়ার আর টেবিল রেখে আমরা এসে দাঁড়ালাম ছাদের কিনারে । যেখানে কৃত্রিম বাগানের বড় গাছ গুলো ছায়া ঝরাচ্ছে । মিনিট দশেকের মধ্যে আকাশে মেঘের আনাগোনা বাড়তে লাগলো । বইতে শুরু করল ঠান্ডা বাতাস । কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে বোধ হয় । আষাঢ়ের শেষ দিনটায় এমন আর্দ্র বাতাসে কিছুটা শঙ্কাই তৈরি হলো । বৃষ্টি নামবে না তো ? তাহলে আড্ডার কী হবে ! সবাই পৌছাতে পারবেতো ?  

আরো কিছুক্ষণ পর মেঘ সরে গিয়ে আলো ফুটলো । রোদের তেজও নেই আগের মতো । আড্ডার উপযুক্ত বৈকালিক আবহ ।  ছাদ বাগানের চারদিকে সারি সারি টবে ফুটে থাকা মাধবী, রঙ্গন, গোলাপ সহ নানা জাতের ফুলেরা হাসছে আর দুলছে এলোমেলো বাতাসে । যেন স্বাগত জানাচ্ছে আমাদের ! প্রাণময় হয়ে ওঠে আড্ডার উঠোন ।  

শুরু হয় বিহঙ্গের ৩৪ তম সাহিত্য আড্ডা । একে একে নারীবাদের নাড়ি-নক্ষত্র তুলে ধরতে লাগলেন কবি তামান্না সাফা । বললেন নারীবাদের উদ্ভব পুরুষের দায়িত্বহীনতা থেকে । পন্থাগত দিক থেকে নারীবাদ দু’রকম । উদার নারীবাদ আর উগ্র নারীবাদ । উদার নারীবাদ শুধু নারীর অধিকারের কথা বলে না । নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকল লৈঙ্গিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলে । এদেশের আর্থ-সামাজিক সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় না নিয়ে যারা উগ্র নারীবাদের চর্চা করেন তারা নারীবাদকে বিতর্কিত করে ফেলেছেন । পুরুষবিহীন নারীর স্বয়ংসম্পূর্ণতার ধারণা প্রকৃতি-বিরুদ্ধ । নারী পুরুষের সম্মিলিত সংগ্রামের মাধ্যমেই নারীর অধিকার ও মর্যাদার পুনরুদ্ধার সম্ভব ।  

আমরা মনোযোগ দিয়েই শুনছিলাম । টেবিলে নাস্তা এসে পড়ায় মনোযোগের কিছুটা ছন্দ পতন হলো বৈকি ! আমরা চায়ের কাপ তুলে নিলাম ।  

তামান্না সাফা বলে যাচ্ছেন ।  পুঁজিবাদে নারীমুক্তির নামে নারীর পণ্যায়ন ঘটে । যার ফলে দিনশেষে নারী অসহায় আর একাকীত্বের শিকার হয় । অন্যদিকে মার্কসীয় নারীবাদ পুরুষের ওপর নারীর আর্থিক নির্ভরতাকেই নারীমুক্তির প্রধান অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করে । এবং জাতীয় শ্রমের মূলধারায় নারীর অংশগ্রহণের মাধ্যমে নারীর মুক্তি ঘটানোর প্রস্তাব করে । তবে ধর্ম, বিশেষতঃ ইসলাম মানুষ হিসেবে নারী পুরুষকে সমান মর্যাদা দিলেও আর্থিক দায়িত্ব থেকে নারীকে অব্যহতি দেয় । এবং পারিবারিক দায়িত্ব গ্রহণে উৎসাহ দেয় । আর পুরুষকে নারীর যাবতীয় আর্থিক চাহিদা পূরণের দায়িত্ব  দেয় । নারী উপার্জন করলেও তা সে পরিবারের জন্য ব্যয় করতে বাধ্য নয় । নারী বা পুরুষ আলাদা ভাবে নয় বরং উভয়ে মিলিত হয়েই একটি সাংস্কৃতিক একক গঠন করে । বক্তব্য শেষ করে তামান্না সাফা কি ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চা খেয়েছিলেন ? আমরা লক্ষ করিনি ।  

সন্ধ্যার পর শুরু হয় আড্ডার দ্বিতীয় পর্ব । ‘ধর্ম ও নারীবাদ’ নিয়ে কথা বলেন ড. শওকত আলী । তাঁর মতে ধর্মের সাথে বিরোধিতার জন্য উগ্র নারীবাদ একা দায়ী নয়, যারা ধর্মের অপব্যাখ্যা করে ধর্ম প্রদত্ত অধিকার থেকে নারীকে  বঞ্চিত করেছে তারাও দায়ী । নারীকে মসজিদে যেতে বাঁধা দেয়া হয় ধর্মের নামেই । নারীর উত্তরাধিকার বুঝে দেয়ার সময় অনেক হাজি সাহেবেরও আসল চেহারা বেরিয়ে পড়ে ।  শিক্ষা, বানিজ্য এবং যুদ্ধ শুধু নয় আইন প্রণয়নেও নারীর অংশ গ্রহণের যে ঐতিহ্য ইসলামে রয়েছে – সে ব্যাপারে অনেক আলেমও সচেতন নন । ধর্ম সম্পর্কে অজ্ঞতাও একটা বড় সমস্যা ।  

সম্পুরক আলোচনায় সিরাজুল ইসলাম বলেন, নারীবাদের সাথে ধর্মের যতটা বিরোধ আছে বলে মনে করা হয় আসলে ততোটা নয় । নারীবাদের চারটি ঢেউ (wave) এর প্রথমটি এসেছিল উনিশ শতকের শেষের দিকে- নারীর ভোটাধিকার এবং সম্পত্তির মালিকানার দাবিতে । এটার সাথে ইসলামের কোন বিরোধ নেই । ১৯৬০ সালে দ্বিতীয় ধাপে  নারী পুরুষের আইনগত ও সামাজিক মর্যাদায় যে সমতার প্রস্তাব করা হয় তাও ইসলাম অনুমোদন করে ।  তবে তৃতীয় ধাপে (১৯৯০) হাজির হওয়া নারীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের (individuality) ধারণা ইসলামের পরিবার কেন্দ্রিক সমাজ প্রস্তাবনার সাথে সাংঘর্ষিক । মূলতঃ তখন থেকেই প্রচলিত ধর্ম সমূহের সাথে নারীবাদের কার্যকর বিরোধ শুরু হয় । যদিও ২০১২ সালে ‘Mee too’ আন্দোলনের মাধ্যমে নারীবাদের যে চতুর্থ ঢেউ শুরু হয় তার সাথে ইসলাম শুধু একাত্মই নয় বরং খানিকটা এগিয়ে, বিশেষতঃ যৌন হয়রানি এবং ধর্ষণের শাস্তিবিধানের ক্ষেত্রে ।  

সব শেষে কথা বলেন মোহাম্মদ শাহাদাতুল্লাহ । তিনি স্বভাব সুলভ সহজ ভাষায় বলেন, আমরা সমস্যার মূলে যাই না । রোগের কারণ না খুঁজে উপসর্গ নিয়ে বেশি তর্ক হয় । মূল সমস্যা অন্যের অধিকারের বিষয়ে সচেতনতার অভাব ।  মানুষ হিসেবে আমরা যখন অন্য মানুষের অধিকারকে অস্বীকার, উপেক্ষা করি, তখনই সমস্যার সূত্রপাত ঘটে । রাষ্ট্র, সমাজ এবং ধর্ম কর্তৃক নারীর যেসব অধিকার ইতোমধ্যে স্বীকৃত আছে, সেগুলোই যদি আমরা বাস্তবায়ন করতে পারি, তাতেই  অনেক সমস্যার সমাধান হয় ।  তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, নারী পুরুষ পরস্পরের প্রতিযোগী নয় বরং সহযোগী । সুতরাং একটা সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে আমরা যেন নতুন সমস্যার জন্ম না দেই ।   

আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে কবিতা পাঠ করেন ওয়ালিউল্লাহ ও মিজান রহমান বর্ণ । শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন শাহজাহান তারিক ও রেজাউল করিম ।       

আড্ডা শেষ । রাত সাড়ে আট টা ।   আমরা চুপচাপ বসে আছি । যাই যাই করেও কেউ উঠছে না । আকাশে তারা নেই । কিন্তু রহস্যময় এক আলো আছে । ছাদ বাগানের পাতার ফাঁকে অদ্ভুত আলোছায়া খেলা করছে । ফুলেরা হাসছে খিলখিলিয়ে । নতুন এক জগতে এসে পড়েছি আমরা । যেন কোথাও আমাদের ফিরে যাবার তাড়া নেই । বাউল বাতাস একটা ঘোরের মধ্যে নিয়ে যায় আমাদের । যেন বলতে থাকে – এখানে থেকেই যাও আজ । অথবা বলে ওঠে- চলো একসাথে ছুটি ! আমরা কিছুটা বিহ্বল হয়ে বসে থাকি । আর প্রকৃতি কথা বলে যায় । আমাদের ঘোর কাটে না । অথচ কেমন এক অভ্যস্ত যান্ত্রিক তাড়নায় আমরা উঠে পড়ি একসময় !            

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top