সম্প্রীতির বয়ান

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উপায় নিয়ে আলোচনা করছিলেন রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুল । রবীন্দ্রনাথ বললেন “দেখ যে, ন্যাজ বাইরেরটাকে কাটা যায়, কিন্তু ভিতরের ন্যাজটা কাটবে কে ? ” রোগটা যে ভেতরের সে কথাই বলতে চেয়েছিলেন তিনি।  আমাদেরকেও ভেতরের রোগটাই সনাক্ত করতে হবে যদি আমরা সম্প্রীতি চাই। সাম্প্রদায়িক সংঘাতের পেছনে কারণ হিসেবে অনেকে রাজনৈতিক চক্রান্ত, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং বৈষম্যজনিত ক্ষোভ -এগুলোর উপর জোর দেন। এটা স্বীকার করেও বলা যায়, চক্রান্তকারীরা চক্রান্ত করবে, দুর্বৃত্তরা সুযোগ নেবার চেষ্টা করবে- কিন্তু জনসাধারণ যদি সঠিক পথে থাকে তবে এদের অপচেষ্টা সফল হবার কথা নয়।  আর প্রশাসনিক দক্ষতা, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগের প্রসঙ্গ প্রধানতঃ দুর্ঘটনার পরের বিষয়। দুর্ঘটনা সংঘটিত হবার পেছনে এসবের দায় থাকলেও তুলনামূলক কম। আগাম তথ্য, গোয়েন্দা দক্ষতা এ জাতীয় ঘটনা রোধ করতে পারে বটে, কিন্তু শুধু এসবের উপর নির্ভর করে একটা দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তেমনি বৈষম্য কিংবা রাজনৈতিক কারণেও এক সম্প্রদায় অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি ক্ষুব্ধ হতে পারে কিন্তু ব্যক্তির অপরাধের দায় যে সম্প্রদায়ের নয়- এই ন্যুনতম চেতনা যদি মানুষের মধ্যে না থাকে তো বাইরের ‘ন্যাজ’ কেটে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। আর অপরাধীর পরিচয় যদি অচিহ্নিত থাকে সেক্ষেত্রে অনুমানের ভিত্তিতে সম্প্রদায় বিশেষের উপর চড়াও হওয়া তো রীতিমত কান্ডজ্ঞানহীনতা। এই অচেতনতাই (‘অসচেতনতা’ আরেকটু উঁচু স্তরের) আমাদের ভেতরের ‘ন্যাজ’। আমাদের ভেতরের আরেক অন্ধকারের নাম ধর্মান্ধতা। ধর্মের প্রতি অন্ধ বিদ্বেষ এবং অন্ধ আবেগ – উভয় প্রকার ধর্মান্ধতার মূলে রয়েছে ধর্মের খন্ডিত জ্ঞান। আমাদের রোগগ্রস্ততার সবচেয়ে বিপজ্জনক উপসর্গ হল মুসলমানকে পাকিস্তান কিংবা সৌদী আরবের প্রতি, হিন্দুকে ভারতের প্রতি, খ্রীষ্টানকে আমেরিকার প্রতি এবং বৌদ্ধকে বার্মা কিংবা চীনের প্রতি নিজ দেশের চেয়ে অধিক অনুরাগী বিবেচনা করা। সম্প্রীতি রক্ষার জন্য আমাদের মনোযোগ দিতে হবে এই সব অন্ধকার নিরসনের প্রতি।

ঐতিহাসিক গলদঃ বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ শুরু হয়েছে এভাবে- “ প্রথম ঘটনা, রাণী রাসমণি হঠাৎ জমিদার হয়ে শেখদের সাথে লড়তে শুরু করলেন, ইংরেজও তাকে সাহায্য করল।” (পৃঃ ৫)

“১৯৩৮ সালের ঘটনা… শেরে বাংলা তখন বাংলার প্রধানমন্ত্রী এবং সোহরাওয়ার্দী শ্রমমন্ত্রী। … বাংলার এই দুই নেতা গোপালগঞ্জে আসবেন। মুসলমানদের মধ্যে বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি হল। … হিন্দু ছাত্ররা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী থেকে সরে পড়তে লাগল। … যাতে বিরূপ সম্বর্ধনা হয় তারও চেষ্টা করা হবে।।… সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাও হতে পারত।” (পৃঃ ১০-১১)

“ মালেককে ধরে নিয়ে হিন্দু মহাসভা নেতা সুরেন ব্যানার্জির বাড়িতে মারপিট করছে, যদি পার একবার যাও।” … “আমরা দরজা ভেঙ্গে মালেককে কেড়ে নিয়ে চলে আসি। … হিন্দু নেতারা রাতে বসে হিন্দু অফিসারদের সাথে পরামর্শ করে একটা মামলা দায়ের করল। … এই আমার জীবনে প্রথম জেল ।” (পৃঃ ১২-১৩)

একই সময়ের সাম্প্রদায়িকতার চিত্র পাওয়া যায় বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারি কালিদাস বৈদ্যের লেখা ‘বাঙ্গালির মুক্তিযুদ্ধে অন্তরালের শেখ মুজিব’ বইটিতে।  “ পূর্ব বাংলার নমঃ সমাজের সর্দাররা হিন্দু ধর্ম ও বর্ধিষ্ণু হিন্দুদের রক্ষা করত। মুসলীম আক্রমন প্রতিহত করতে তারা ছিল সর্বদাই প্রস্তুত।” (পৃঃ ১২)

“ সে সময় অপর পারে জমি ভাঙত আর আমাদের পারে জেগে উঠত চর। সেই অন্যপারে ছিল মুসলমানদের বাস। সংগঠিত নমঃসমাজ এতই শক্তিশালী ছিল যে, নদীর কোলে জমি হারালেও মুসলমানরা এপারে এসে তাদের জমির চর দখল করার সাহস দেখাতনা।” (পৃঃ ১৩)

দু’টি বইই সাক্ষ্য দিচ্ছে সাম্প্রদায়িকতা কবলিত তৎকালীন সমাজ বাস্তবতার। কিন্তু এই চিত্র আবহমান কালের নয়। ইংরেজ আগমনের পর বাংলার অসাম্প্রদায়িক চরিত্র বিনষ্ট হয়ে সাম্প্রদায়িকতা হয়ে দাঁড়ায় ইতিহাসের অনিবার্য অনুষঙ্গ। যে কারণে নিকট অতীতের ইতিহাস চর্চার সাথে সাম্প্রদায়িকতা চর্চার একটা ঝুঁকি থেকে যায়। অথচ ইতিহাসের যেটুকু চর্চা এদেশে হয় তার বেশির ভাগ জুড়ে থাকে এই সাম্প্রদায়িকতায় আচ্ছন্ন নিকট অতীত। এর পরিবর্তে চর্চায় আনতে হবে বাংলার সামগ্রিক ইতিহাস যেখানে শিকড় ছড়িয়ে আছে বাংলার অসাম্প্রদায়িক সমাজ চেতনা। একদিকে আমাদের চর্চিত ইতিহাসের কেন্দ্রে আছে সাম্প্রদায়িকতা, তার ওপর রয়েছে পক্ষপাতমূলক ইতিহাস বিকৃতির প্রকল্প। রয়েছে নিজ সম্প্রদায়ের শাসক আর নেতাদের বীর হিসেবে উপস্থাপনের পাশাপাশি ভিন্ন সম্প্রদায়ের শাসক আর নেতাদের দুষ্কৃতিকারী, অত্যাচারী, খলনায়ক আর চরিত্রহীন হিসেবে অপনির্মাণের প্রক্রিয়া। নাটক, সিনেমা, আর বইপত্রে আছে এই আয়োজন। নৈর্ব্যক্তিক ইতিহাস চর্চা, ইতিহাস জ্ঞানের ইতিবাচক প্রয়োগ এবং পক্ষপাতহীন ইতিহাস লিপিবদ্ধ করাও তাই সম্প্রীতির গুরুত্বপূর্ণ সোপান। 

প্রচলিত বয়ানঃ সম্প্রীতির যে বয়ানটি আমাদের সামনে উপস্থিত আছে তার যৌক্তিকতা থাকলেও কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে তা আশানুরূপ ফল দিতে পারছেনা। বিশেষ করে ‘সাম্প্রদায়িকতা’ শব্দটির রাজনৈতিক ব্যবহারের কারণে সাম্প্রদায়িকতার সঠিক ধারণাটি জনমনে স্পষ্ট হতে পারেনি। প্রকৃতপক্ষে সাম্প্রদায়িকতা বলতে ধর্ম চর্চা কিংবা নিজ সম্প্রদায়ের জন্য কাজ করা বুঝায়না। বরং ভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ, ঘৃণা কিংবা ক্ষতির চিন্তা লালনই সাম্প্রদায়িকতা।  এই মাপকাঠিতে এদেশের অধিকাংশ মানুষই উত্তীর্ণ। সুতরাং সাম্প্রদায়িকতা শব্দটি অধিকাংশ মানুষের বিপক্ষে নয়। এই কথাটি জনসাধারণের কাছে, এমনকি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষিত মানুষের কাছেও স্পষ্ট নয়। তাদের কাছে সাম্প্রদায়িকতা মানে ধর্ম চর্চা, বিশেষতঃ ইসলাম চর্চা। একারণে স্বল্প সংখ্যক শিক্ষিত মানুষের কাছে প্রচলিত বয়ানটির বুদ্ধিবৃত্তিক আবেদন থাকলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মূল্যবোধের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় এটি একটি ব্যাপক সামাজিক চেতনাগত পরিবর্তন আনতে পারছেনা।

প্রচলিত বয়ানে সম্প্রীতি রক্ষায় ব্যাপক সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড এবং মূলধারার শিক্ষার প্রসারের কথা বলা হলেও এর সুফল পেতে আমাদের দীর্ঘকাল অপেক্ষা করতে হবে। থাকতে হবে বিপুল বাজেটও। এরপরও ভিন্ন ধর্মের মানুষের অনুভুতি ও অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল সমাজ নির্মাণ এক অনিশ্চিত অভিযাত্রা বটে। এখান থেকে ফসল তুলতে হলে মূলধারার পাঠ্যক্রমে নাগরিক সাম্যের ধারণার পাশাপাশি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে ধর্মের পারস্পারিক অধিকার বিষয়ক শিক্ষা সমূহ। যেমন – ভিন্ন ধর্মাবলম্বীর জীবন, সম্পদ ও সম্মান মুসলমানের কাছে আমানত । এবং ইসলামে মূর্তিপূজা নিষিদ্ধ হলেও ভিন্ন ধর্মাবলম্বীর ধর্মীয় অধিকারে হস্তক্ষেপ করা যে ইসলাম সম্মত নয় –এই সীমারেখাটি স্পষ্টতর করতে হবে। 

বাংলাদেশী দাওয়াইঃ যেহেতু বিদেশি দাওয়াই এই মাটিতে কার্যকর হবার ইতিহাস নেই সুতরাং আমাদের ভাবতে হবে দেশজ ভাবনা। দুর্বৃত্তের জন্য আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি দেখতে হবে এরা কোন শ্রেণি থেকে আগত। এদের কাছে মনুষ্যত্বের ধারণা, সততা ও মানবিক মূল্যবোধ পৌছানোর কার্যকর মাধ্যমগুলো বাছাই করাটা গুরুত্বপূর্ণ। 

ধর্মীয় শিক্ষাঃ বাংলাদেশে অনানুষ্ঠানিক ধর্মীয় শিক্ষার প্রধান মাধ্যম ওয়াজ মাহফিল। আনুষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া কিংবা ধর্মের সীমিত জ্ঞানের মানুষের কাছে ধর্মের বাণী পৌছানোর ক্ষেত্রে ওয়াজ মাহফিলগুলো পালন করে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। সাম্প্রতিক বছর গুলোতে দেশে ওয়াজ মাহফিল এবং ইউটিউবে এ জাতীয় ভিডিওর দর্শক সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও  ধর্মীয় আবেগের তুলনায় ধর্মের মানবিক শিক্ষা প্রচারে এখনো পিছিয়ে আছে মাধ্যমটি। এটি হতে পারে সম্প্রীতির শিক্ষা ছড়িয়ে দেবার অন্যতম কার্যকর উপায়। এজন্য ধর্মীয় বক্তাদের বক্তৃতায় জোর দিতে হবে অমুসলিমের অধিকারের বিষয় গুলোর প্রতি।

আনুষ্ঠানিক মাধ্যম হিসেবে মাদ্রাসা শিক্ষায়ও ভিন্ন ধর্মের মানুষের অধিকারের সুরক্ষা বিষয়ক জ্ঞানের চর্চা বাড়াতে হবে।

আন্তঃধর্মীয় প্রতিযোগিতাঃ দু’টি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে ধর্ম সমূহের মধ্যে সংলাপ এবং প্রতিযোগিতা সম্প্রীতির ক্ষেত্রে কাজে আসতে পারে। প্রথমতঃ এ জাতীয় সংলাপে ধর্মগুরু বা ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ ধর্ম সমূহের সাদৃশ্য এবং সাধারণ মানবিক শিক্ষা সমূহ তুলে ধরবেন। দিতীয়তঃ ভিন্ন ধর্মের মানুষের মর্যাদা ও অধিকার সংরক্ষণে কোন ধর্ম কত বেশি দায়িত্বশীল এবং উদার সে বিষয়টি তুলে ধরার প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করতে পারলে তা পক্ষান্তরে সমাজে ধর্মীয় উদারতা ও সহনশীলতাই বিস্তৃত করবে। এই প্রতিযোগিতা শুধু দেশীয় নয় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও সম্প্রদায় সমূহের সম্পর্ক উন্নয়নে কাজে আসবে।

সামাজিক উদ্যোগঃ শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের নিষ্ক্রিয়তা-নিস্পৃহতাও সংকট গভীরতর হবার ক্ষেত্রে অনেকাংশে দায়ী। একারণে যৌতুক, মাদক অথবা দূষণের মত সাম্প্রদায়িকতাকে একটি সামাজিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে এর নিরসনের জন্য দেশব্যাপী সামাজিক উদ্যোগ নিতে হবে। সব ধর্মের মানুষের সমন্বয়ে ‘অধিকার সুরক্ষা কমিটি’ বা ‘সম্প্রীতি রক্ষা উদ্যোগ’- ইত্যাকার নামে সামাজিক সংগঠন গড়া যেতে পারে। যারা সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি আইন অনুমোদিত পন্থায় ভূমিকা রাখতে পারে। যাদের চেতনায় থাকবে নজরুলের বাণী-

“হিন্দু না, ওরা মুসলিম! ওই জিজ্ঞাসে কোন জন!

কান্ডারী! বলো, ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মা’র”

একটি ব্যাপক সামাজিক পরিবর্তনের জন্য আমাদের জোর দিতে হবে সেই পন্থার ওপর যেটি সহজ, দ্রুত কার্যকর, এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পর্কিত। মনে রাখতে হবে, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের প্রতি সংবেদনশীলতা ও মমত্ব ব্যতিরেকে সম্প্রীতি রক্ষার যে কোন পন্থা বুদ্ধিবৃত্তির নিরিখে তত্ত্ব হিসেবে অমরত্ব লাভ করলেও গণবিচ্ছিন্নতার কারণে ব্যর্থ হতে বাধ্য। সম্প্রীতির বয়ান নির্মাণ করতে গিয়ে আমরা যেন বিভেদের বয়ান নির্মাণ না করি। একটি স্বাধীন দেশে নিজেদেরকে আমরা বিভক্ত করে রাখব কার স্বার্থে ?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top