মধ্যবিত্ত যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ

মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে সুবিধাবাদী বলার রেওয়াজ আছে। 

হ্যাঁ, কথাটা মিথ্যে নয়। মধ্যবিত্তরা সুবিধাবাদী তো বটেই। কিন্তু শুধু সুবিধাবাদী বলে দোষারোপ করলে মধ্যবিত্তদের সম্পর্কে সবটুকু কথা বলা হয় না। ধনী আর গরীবের মাঝখানে ঝুলে থাকা এই অর্থনৈতিক শ্রেণীটাকে নিয়ে আরেকটু বিশ্লেষণের প্রয়োজন আছে।

ধনীদের মূল শক্তি তাদের সম্পদের বিশাল পাহাড়; এক কথায় পুঁজি। পুঁজিকে ব্যবহার করেই তারা ক্ষমতাবান হয়।  গরীবদের ভরসা মূলত শারীরিক শ্রম। পরিশ্রম করেই তাদের দু’বেলা ডাল ভাত জোটাতে হয়। শরীরটাই তাদের সম্পদ।

তাহলে মধ্যবিত্তের শক্তি কী? এই শ্রেণীটা টিকে থাকে কিভাবে? 

এই শ্রেণীর প্রধান অবলম্বন লেখাপড়া, জ্ঞান, কারিগরি দক্ষতা। এদের কি সম্পদ নেই? হ্যাঁ আছে। সীমিত সম্পদ এদের আছে, খুব অল্প পুঁজিও তাদের আছে। সেই সম্পদ তারা ব্যবহার করতেও জানে। কিন্তু পরিমাণে সেই সম্পদ নিতান্তই সামান্য। তা দিয়ে ধনীদের মতো ক্ষমতাবান হওয়া যায় না; সরকারের উপর চাপ প্রয়োগ করা যায় না।

মধ্যবিত্তরা সাধারণত লেখাপড়াটাকেই আঁকড়ে ধরে। সন্তানকে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার বানানোর স্বপ্ন দেখে। এটা ছাড়া আর উপায়ও থাকে না তাদের। না, জ্ঞান চর্চার প্রতি কোন অকৃত্রিম ভালোবাসা নেই তাদের। লেখাপড়া তাদের অন্ন বস্ত্রের একটা উপায় মাত্র। এরচেয়ে বেশি কিছু নয়।

সমাজে গরীবরা প্রতিনিয়ত শোষিত হয়। গরীবদের শোষনটা স্পষ্টই বোঝা যায়। শ্রমিক পর্যাপ্ত মজুরি পায় না, কৃষক তার ফসলের ন্যায্য দাম পায় না – এসবই দেখি আমরা। এই শোষণটা করে প্রধানত ধনীরা। গরীবের রক্ত চুষেই এরা আরও ধনী হয়। 

মধ্যবিত্তের অবস্থাটা কিন্তু একটু অদ্ভুত। সে নিজে শোষিত হয়, আবার সে শোষণ করে। সে শোষিত হয় ধনীদের দ্বারা আর সে শোষণ করে গরীবকে। বাসার গৃহকর্মীকে সে বঞ্চিত করে ; আবার শ্রমিকের অধিকারের জন্য সে পত্রিকায় কলাম লেখে। সোজা বাংলায় মধ্যবিত্তের এই আচরণকে ভণ্ডামি বলা যায়। সেটা বলা হয় প্রায়ই। কিন্তু এটাই শেষ কথা নয়। কথা আরেকটু আছে। 

জ্ঞান চর্চার প্রক্রিয়াটা মূলত মধ্যবিত্তের দখলে থাকে। জ্ঞান চর্চার এই প্রক্রিয়াটা গুরুত্বপূর্ণ।  এটা ছাড়া সভ্যতা এগোতে পারে না। ধনীরাও কখনো কখনো লেখাপড়া করে বটে, জ্ঞানচর্চায় আত্মনিয়োগ করা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। জীবনের আরও অসংখ্য বিলাস উপকরণ তাদেরকে ঘিরে আছে। এগুলো বাদ দিয়ে লেখাপড়ার কষ্ট সাধ্য প্রক্রিয়াটাতে সময় দেয়া তাদের হয়ে ওঠে না। 

গরীবরাও লেখাপড়া করে। গ্রামের কৃষকের সন্তানও সরকারি আমলা হয়। কিন্তু এই খানে একটা মৌলিক পরিবর্তন ঘটে যায়। গরীব যখন লেখাপড়া করে চাকরি করতে শুরু করে তখনই সে উঠে আসে মধ্যবিত্তের কাতারে। গ্রামে লেখাপড়া করা কেরানীর মধ্যে মধ্যবিত্তসুলভ মন-মানসিকতাই প্রাধান্য লাভ করে। তাকে আর তখন গরীব বলা যায় না।

তাহলে ব্যাপারটা কিরকম দাঁড়ালো? 

জ্ঞান প্রধানত মধ্যবিত্তের। জ্ঞানের শক্তিকে কাজে লাগাতে জানে মধ্যবিত্ত। জ্ঞান সবারই প্রয়োজন। বিজ্ঞানের গবেষণার ফল সবারই উপকারে আসে। কিন্তু এই জ্ঞানের জন্য মধ্যবিত্তের উপর নির্ভর করতে হয়। ধনীরা তাদের স্বার্থে বিজ্ঞানকে কাজে লাগায়। কিন্তু এই কাজটা ধনীরা একা করতে পারে না। মধ্যবিত্তের সহযোগিতা তার প্রয়োজন।

মধ্যবিত্তরা কি তাহলে ধনীদের পক্ষেই কাজ করে? হ্যাঁ,  তা তো করেই। গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির ম্যানেজার মধ্যবিত্ত। মালিকের পক্ষেই তাকে থাকতে হয়, মালিককে সন্তুষ্ট রাখতে হয়। শ্রমিকের পক্ষে যাওয়ার সুযোগ তো তার নেই। শ্রমিকের পক্ষ নিলে তার তো আর ফ্যাক্টরির ম্যানেজার থাকা চলে না।

কিন্তু এইখানে খানিকটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটে। মধ্যবিত্তের অবস্থান আসলে খুব সুনির্দিষ্ট নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সে ধনীদের পক্ষে থাকে। কিন্তু মাঝে মাঝে সে গরীবদের পক্ষে চলে আসে, শ্রমিকের অধিকার নিয়ে কথা বলে। এদেশেও সেটা দেখি আমরা। 

মধ্যবিত্ত শ্রেণীর এই পক্ষ পরিবর্তনের কারণ কী? কারণটা আগেই বলেছি। মধ্যবিত্ত নিজেও ধনীদের দ্বারা শোষিত হয়। গরীবদের তুলনায় সে একটু কম শোষিত হয়, কিন্তু তবুও শোষণ আছে অবশ্যই। এই শোষণ যতক্ষণ সীমিত মাত্রায় থাকে, ততক্ষণ সে ধনীদের পক্ষেই কাজ করে। কিন্তু এই বঞ্চনা বেশি হয়ে গেলে সে ধনীদের বিপক্ষে চলে যায় এবং স্বাভাবিক কারণেই গরীবদের সাথে ঐক্য গড়ে তোলে। ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে যে কোন প্রতিবাদে এই সময়টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যবিত্ত – নিম্নবিত্ত যখন ঐক্য গড়ে তোলে তখন ধনীরা খুব বড় ধরনের বিপদে পড়ে। এই রকম অবস্থাতেই সমাজের ক্ষমতা কাঠামোতে বড় ধরনের মৌলিক পরিবর্তন আসে। এই কারণেই ধনীদেরকে চেষ্টা করতে হয় মধ্যবিত্তকে সন্তুষ্ট রাখার। নিম্নবিত্তকে যতখুশি বঞ্চিত করা যায়, কিন্তু মধ্যবিত্তের ক্ষেত্রে সেটা সম্ভব নয়। মধ্যবিত্তকে বেশি অসন্তুষ্ট করার অর্থ ক্ষমতাবানদের বিপদ ডেকে আনা। 

আমাদের দেশেও সেটাই দেখি আমরা। রাষ্ট্র কৃষক শ্রমিককে প্রতিনিয়ত বঞ্চিত করছে। কিন্তু মধ্যবিত্তকে বেশি ঘাঁটানোর সাহস তার নেই। তাই আমলা, সাংবাদিক, চিকিৎসক,  আইনজীবী – এদেরকে সুযোগ সুবিধা দিতে ক্ষমতাবানরা প্রস্তুত। অথচ কৃষক বা শ্রমিককে নিয়ে রাষ্ট্রের অত মাথা ব্যাথা নেই।

গরীবদেরকে বঞ্চিত করে এবং মধ্যবিত্তকে তুষ্ট করে এই পুরো ব্যবস্থাটা এভাবে বেশ ভালো ভাবেই চলতে পারে। কিন্তু একটা সমস্যা দাঁড়ায় যখন মধ্যবিত্ত শ্রেণী সংখ্যায় বড় হতে থাকে। একটা দেশের জনসংখ্যার একটা বড়ো অংশ যদি মধ্যবিত্ত হয়, তখন এই শ্রেণীটাকে সন্তুষ্ট করাটা ধনীদের পক্ষেও কঠিন হয়ে যায়।

সাধারণত মধ্যবিত্তরা ঝুঁকি নিতে ভয় পায়। এদের সম্বল খুব অল্প। সেটুকু প্রাণপণে আঁকড়ে ধরেই এরা বাঁচে। এ অর্থে মধ্যবিত্তদেরকে ভীতু বললে ভুল হয় না। 

আরও একটা ব্যাপার আছে, সেটা হচ্ছে মধ্যবিত্তের আত্মমর্যাদাবোধ। এই শ্রেণীটার – বিশেষ করে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের এক ধরনের আত্মসম্মানবোধ থাকে। এই আত্মমর্যাদাবোধের জায়গাটাতে আঘাত লাগলে সে সহ্য করতে পারে না।

তাই সমাজ বা রাষ্ট্রে পরিবর্তন আনার জন্য এই মধ্যবিত্ত শ্রেণীটাকে একটু উসকানি দিতে হয়। এই উসকানিতে অনেক সময় বেশ কাজ হয়, অতীতে হয়েছে। মধ্যবিত্তদের আত্মসম্মানবোধে আঘাত লাগলে এরা হঠাৎ করে বিগড়ে যেতে পারে। আত্মমর্যাদাবোধে আঘাত দেওয়ার এই কাজটা পরিবর্তনের স্বপ্নদ্রষ্টাদের করতে হয়।

এসব কারণেই মধ্যবিত্ত শ্রেণীর চিন্তাজগতটাকে বোঝাটা খুব জরুরী। এদের আশা আকাঙখার মূল্যায়ন করা আরও অনেক বেশি জরুরী। 

রাষ্ট্র ও সমাজের একটা মৌলিক পরিবর্তনের জন্য শেষ পর্যন্ত  মধ্যবিত্তদের দিকেই আমাদের তাকিয়ে থাকতে হবে। কারণ এই শ্রেণীটার মূল্যবোধ, এদের শিক্ষা এবং এদের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন রাষ্ট্র আর সমাজে ঘটবেই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top