২০২০ সালের ১৬ ডিসেম্বর আমাদের বিজয় দিবসের ৪৯ তম বর্ষপূর্তি । স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, বিজয়, পতাকা, ইত্যাদি শব্দগুলো প্রত্যেক জাতির গৌরবের স্পর্শবিন্দু । স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অধিবাসী হিসেবে আমাদের গৌরবোজ্জ্বল স্বাধীনতা দিবস প্রতি বছর আমাদের মাঝে ঘুরে আসে দেশের স্বাধীনতার জন্য আমাদের ত্যাগ ও কুরবানীকে স্মরণ করাতে, আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধকে সজাগ করতে, দেশ ও জাতি হিসেবে আমাদের অগ্রগতির পর্যালোচনা করতে, দেশের উন্নয়ন অগ্রগতিতে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার প্রয়াস কতটা সফল হয়েছে তার মূল্যায়ন করতে; সর্বোপরি দেশপ্রেমের পরীক্ষায় আমরা কতটা উত্তীর্ণ তার হিসাব নিকাশ করতে। একটি স্বতসিদ্ধ কথা রয়েছে ‘‘স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন।’’ এ কথাটি যদি সব সময় আমরা আমাদের জাতির বিবেকের সামনে রাখি তা’হলে এ ‘কঠিন’ দায়িত্বটিও হয়তো আমরা সহজে পালন করতে পারবো। জাতি হিসেবে আমাদের যাত্রাপথের নানা বাঁকে নানা সময় ঘাত প্রতিঘাত এসেছে এবং আসবে। সম্মিলিতভাবে সাহসের সাথে সব ঝড় ঝঞ্ঝা আমাদের উৎরে যেতে হবে। এর জন্য পেছন থেকে আমাদের প্রেরণা যোগাবে আমাদের সমৃদ্ধ ইতিহাস আর ঐতিহ্য।
১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজ উদ্দৌলার পতনের পর উপমহাদেশ থেকে ইংরেজ তাড়ানোর আন্দোলনে সচরাচর আমরা যাদের নায়ক হিসেবে চিহ্নিত করি তারা হলেন মীর কাসিম, টিপু সুলতান, সৈয়দ আহমদ বেরেলবী, তিতুমীর, হাজী শরীয়তুলাহ, মজনুশাহ, টিপুশাহ, প্রমুখ। কিন্তু ঢাকার আরেক স্বাধীনতাকামী বীরের নাম আমরা প্রায়ই বিস্মৃত হই। এ স্বাধীনতাকামী নায়কের নাম ছিল নবাব সামস-উদ-দৌলা। তাঁর স্বাধীনতা প্রচেষ্টার ইতিহাস বলতে গেলে এর একটু ভূমিকা টেনে নিতে হয় ।
১৭৫৭ পূর্ববর্তী কয়েক বছর সহ আজ পর্যন্ত আড়াইশ বছরের ক্ষমতার পালাবদল এবং রাজনীতির উপর সমীক্ষা চালালে আমাদের বর্তমান রাজধানী শহর ঢাকা বিবেচিত হবে একটি প্রধান কেন্দ্র হিসেবে। কারন এ সময়কালে ঢাকাকে কেন্দ্র করেই রাজনীতির উত্থান-পতন সবকিছু আবর্তিত হয়েছে। কলকাতা নগর পত্তন সহ ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ স্থাপন এবং ফরাসী ও অন্যন্য কুঠী স্থাপনে ঢাকার সুবাহদার এবং নায়েব নাযিমগণই মূখ্য ভূমিকা পালন করেন। আমাদের স্বাধীনতা হারানোর বেদনার কৃষ্ণকায় অভিশপ্ত পলাশী যুদ্ধের কার্যকারণের মূলেও রয়েছে এ ঢাকা । আলীবর্দীখানের শাসনকালের শেষ দিকটায় ঢাকায় কর্মরত নাওয়ারা মহালের পেশকার রাজবলভ যখন এখানকার ভারপ্রাপ্ত প্রশাসক মাত্র দু’বছর সময়কালে তিনি দু’কোটি টাকা হস্তগত করেন। শাহামৎ জংয়ের মৃত্যুর পর রাজবলভ পুত্র কৃষ্ণবলভ বা কৃষ্ণদাস ‘জগন্নাথ দর্শনের’ ভান করে এ দু’ কোটি টাকার বেশীরভাগ অংশ নৌকায় বোঝাই করে পালিয়ে গিয়ে কলকাতার ইংরেজ ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গে আশ্রয় নেয়।
কৃষ্ণবলভকে আশ্রয় না দেয়া এবং সমুদয় টাকা ফেরত দিতে সিরাজউদ্দৌলার নির্দেশ অমান্য করাতেই সিরাজের সাথে ইংরেজদের দ্বন্ধ বাধে এবং পরবর্তীতে ইংরেজদের সাথে সিরাজের যুদ্ধের পরিনামে বাংলার স্বাধীনতা হারানোর ঘটনা ঘটে। ফলে দেখা যায় ঢাকার ষড়যন্ত্রই ছিল স্বাধীনতা হারানোর মূখ্য কারন। এ ঢাকা যেমন স্বাধীনতা হারানোর ষড়যন্ত্রকারীদের জন্ম দিয়েছে আবার কেড়ে নেয়া স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের নায়কের জন্মও হয়েছে এ ঢাকায়। অত্যন্ত বৈরী পরিবেশে স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজী রেখে ঝুঁকি গ্রহণকারী এমনি এক বীর সন্তান জন্ম নিয়েছিলেন ঢাকায় যাঁর কথা এখানে আলোচনা করা হয়েছে।
আলীবর্দীর সময় থেকে ঢাকায় কর্মরত সরকারী মোহরার জেসারত খান ১৭৫৭ সালের পট পরিবর্তনের পর ঢাকায় রাজবলভের উত্তরাধিকারী নিযুক্ত হন। একজন সুদক্ষ প্রশাসকের গুণাবলী তাকে শত ঝড় ঝঞ্ঝার ভেতর দিয়েও ক্ষমতা থেকে বিচ্যুত করেনি। একজন মোহরার থেকে নায়েব এবং পরবর্তীতে নায়েব নাজিম পদে ১৭৮১ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকায় কর্মরত ছিলেন। তাঁর একমাত্র কন্যার বিয়ে দিয়েছিলেন আরব দেশে থেকে আগত মীর মুর্তজার নিকট। ঢাকায় মীর মুর্তজার তিন ছেলে জন্মগ্রহণ করেন । তাঁরা হলেন যথাক্রমে হাসমৎ জং, নুসরৎ জং এবং সামস উদ দৌলা। পর্যায়ক্রমে তাঁরা ঢাকার নায়েব নাজিম পদে ১৮৩১ পর্যন্ত বহাল ছিলেন। শেষোক্ত জন নবাব সামস উদ দৌলাকে নিয়েই আজকের এ লেখা ।
১৭৫৭ পরবর্তী মীরজাফর আলী খানের শাসনকালে ইংরেজগণ মীর জাফর আলীর জামাতা মীর কাসিমকে ক্ষমতায় বসিয়ে মীরজাফরকে গদিচ্যুত করে। মীর কাসিম বুঝতে পারেন যে, ইংরেজদেরকে এদেশ থেকে তাড়াতে হবে। ফলে ইংরেজদের সাথে মীর কাসিমের বিরোধ বাধে। মীর কাসিম স্বাধীনতা হারানোর মূল ষড়যন্ত্রকারী রাজবলভ ও তৎপুত্র কৃষ্ণবলভকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেন। তাঁর নির্দেশ ছিল ঢাকায় কর্মরত ইংরেজদের একযোগে হত্যা করা। কিন্তু জেসারত খান উদারতা বশত এদেরকে হত্যা না করে ছেড়ে দেন। বক্সারের যুদ্ধে মীর কাসিমের পরাজয় পরবর্তী ১৭৬৫ সালে ইংরেজ ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানী সরাসরি বাংলার দেওয়ানী লাভ করলে জেসারত খানের এ মহানুভবতার পুরষ্কার হিসেবে তাঁকে ঢাকার নায়েব নাজিম নিযুক্ত করেন। মীর কাসিমের পর মহীশুরের টিপু সুলতান ১৭৮২ থেকে ১৭৯৯ পর্যন্ত আঠার বছর স্বাধীন সালতানাত পরিচালনার পর ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অংশ নিয়ে শেষ পর্যন্ত শাহাদাৎবরণ করেন। এরপর যে লোকটি আমাদের হারানো স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারে এবং বিদেশী বেনিয়া ইংরেজ তাড়ানোর আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি ছিলেন ঢাকার ছেলে নবাব সামস-উদ-দৌলা( ১৭৭০-১৮৩১)।
সিরাজদ্দৌলার সময় থেকেই ফরাসীরা বরাবর আমাদের স্বাধীনতা রক্ষায় সহযোগিতা দিয়ে আসছিলো। টিপু সুলতান ফরাসী বীর নেপোলিয়ান বোনাপার্টের সাথে যোগাযোগ করে ইংরেজ তাড়াতে সাহায্য কামনা করেছিলেন। তাঁর এ উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। ঢাকার নায়েব নাজিম সামস-উদ-দৌলাও এটা বুঝেছিলেন যে এদেশ থেকে ইংরেজ তাড়াতে না পারলে জাতির প্রকৃত মুক্তি আসবে না। নবাব সামস-উদ-দৌলা বিয়ে করেছিলেন মুর্শিদাবাদের নায়েব নাজিম মোবারক উদ্দৌলার মেয়ে বদরুন্নিসা বেগমকে। সে সুবাদে সেখানে তাঁর যাতায়াত ছিল। তিনি ছিলেন খুবই শিক্ষিত, বিচক্ষণ, বুদ্ধিমান ও সাহসী। তিনি আরবী, ফার্সী, বাংলা ছাড়াও ইংরেজী ভাষায় ছিলেন সুপন্ডিত। ফলে তিনি তাঁর ভাই নবাব নুসরৎ জং এর শাসন কালেই (১৭৯৬-১৮২৩) টিপু সুলতানের বিচক্ষণ পলিসি অর্থাৎ কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার নীতি অবলম্বণ করেন। তিনি ফরাসীদের সহযোগিতায় ইংরেজ তাড়ানোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ১৮৯৬ সালে তিনি মুর্শিদাবাদের নবাবপুত্র এবং তাঁর শ্যালক নবাবজাদা নাসির উল মুলক এর সাথে ইংরেজ বিরোধী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেন। ইংরেজরা বিষয়টি আঁচ করতে পেরে নবাব সামস উদ দৌলাকে ঢাকায় চলে আসার জন্য নির্দেশ দেন। নবাব সামস উদদৌলা ইংরেজদের এ নির্দেশে তোয়াক্কা না করে সেখানেই থেকে যান। ১৭৯৯ সালে তিনি অযোধ্যার নবাব আসফ আলীর পুত্র ওয়াজীর আলীর সাথে এক রক্তাক্ত ষড়যন্ত্রের অভিযোগে অভিযুক্ত হন। ওয়াজির আলীর বাসা তলাসীর সময় পারস্য সম্রাট জামান শাহ কে লক্ষ্য করে শামস-উদ-দৌলার একটি পত্র পাওয়া যায়। এ পত্রের আর্জিতে পারস্য সম্রাটকে ভারত উপমহাদেশে ইংরেজ কোম্পানী অধিকৃত অঞ্চলসমূহে আক্রমন করে দখল করে নেবার আহবান জানানো হয়। এ আহবানের সমান্তরালে নবাব সামসউদ দৌলার পরিকল্পনা ছিল মাস্কট থেকে কিছু আরব যোদ্ধাদের এনে এবং বাংলার জমিদারদের একত্রিত করে ইংরেজদের বি্রুদ্ধে লড়াই করা এবং তাদের এ দেশ থেকে বিতাড়ন। লক্ষনৌর নবাব এবং বিহারের জমিদারদের সঙ্গে তিনি এ কাজে যোগাযোগ করেন এবং যৌথ প্রয়াসে একযোগে বিভিন্ন প্রদেশ থেকে ইংরেজ তাড়ানোর কৌশল অবলম্বন করেন। ১৮০০ সালে মীর্জা জান তাপস এর সঙ্গে বাংলায় বৃটিশ ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানী সরকার ধ্বংস করার এবং আভ্যন্তরীণ বিপদ সৃষ্টি ও দেশদ্রোহিতামূলক চিঠিপত্র আদান-প্রদান ইত্যাদির অভিযোগে তিনি বিহারের জমিদারের সঙ্গে অভিযুক্ত হন। নবাব সামস-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে ইংরেজদের আনীত এ অভিযোগের ভিত্তিতে ইংরেজগণ তাঁকে গ্রেফতার করে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গে অনেক দিন বন্দী করে রাখে। ঢাকার নায়েব নাজিম নুসরৎজং এর অনুরোধে পরবর্তীতে ইংরেজগণ তাঁকে মুক্তি দেয়। কিন্তু ইংরেজগণ কখনো সামস-উদ-দৌলার প্রতি আর তাদের বিশ্বাস স্থাপন করতে পারেনি। তাঁকে মুক্তি দেয়া হলেও ইংরেজগণ সব সময় তার প্রতি কড়া নজর রাখতো। এ ছাড়া কোম্পানী সরকার কর্তৃক তাঁর জন্য মঞ্জুরীকৃত ভাতা ৬,০০০/- টাকা থেকে কমিয়ে ৪,৫০০/- টাকা করা হয়। তাঁকে প্রদত্ত নিযামত, জায়গীর ও খাস সম্পত্তি সব বাজেয়াপ্ত করা হয়। তার গতিবিধি নিয়ন্ত্রণে ঢাকায় এক পাটুন সৈন্য এবং দুটি কামান সব সময়ের জন্য রাখার ব্যবস্থা করা হয়। তদানীন্তন কোম্পানী বাগ এলাকায় এক প্লাটুন সৈন্য মোতায়েন করার সময় থেকেই মোতায়েন স্থালটি পল্টন নাম ধারণ করে। এর পাশেই গোলাবারুদ রাখার স্থানটির নাম হয় তোপখানা। এভাবে একজন স্বাধীনতাকামী বীরকে পাহারা দেবার জন্য নিয়োজিত প্লাটুনটির নামকে কেন্দ্র করে পল্টন নামটির উৎপত্তি হয়। কোম্পানী সরকার থেকে প্রাপ্ত ৪,৫০০/- টাকার ভাতা ছাড়াও তিনি মুর্শিদাবাদ নেজামৎ থেকে জামাই হিসেবে প্রাপ্ত দেড় হাজার টাকার ভাতায় তার খরচাদি নিতেন। ১৮২৩ সালে তাঁর ভাই ঢাকার নায়েব নাজিম নুসরৎ জং এর মৃত্যুর পর তিনি ‘আমির“ল মুলক সামস-উদ-দৌলা সৈয়দ আহমদ আলী খান বাহাদুর জুল ফাক্কার জং’ উপাধি নিয়ে ঢাকার নায়েব নাজিম পদে তথা নবাবের মসনদে আরোহন করেন। বৈরী পরিবেশে তিনি মাত্র কয়েক বছর শাসনকার্য পরিচালনা করেন। ইংরেজদের বিরাগভাজন নবাব হিসেবে তাঁর গতিবিধি ছিল অনেকটা নিয়ন্ত্রিত। একটি ল্যান্ডো গাড়ীতে করে তিনি মাঝে মধ্যে কোথায়ও যাতায়াত করতেন। লোকদের সাথেও তাঁর দেখা সাক্ষাতের মাত্রা ছিল কম । ১৮২৪ সালে বিশপ হেবার আন্টাঘর ময়দান (বর্তমান বাহাদুরশাহ পার্ক) সংলগ্ন গীর্জা উদ্বোধন করার জন্য যখন ঢাকায় আসেন তখন তিনি নবাব সামস-উদ-দৌলার সাথে দেখা করেন। তিনি তাঁর আতিথেয়তা, আভিজাত্য ও জ্ঞান গরিমার পরিচয়ে বিমুগ্ধ হন। বিশপ হেবারের বর্ণনা থেকে নবাব সামস-উদ-দৌলার সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার জ্ঞান সম্পর্কেও সম্যক অবহিত হওয়া যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানায় অবস্থইত বর্তমান এশিয়াটিক সোসাইটি অফিসটি তখন বার দুয়ারী প্রাসাদ এবং নিমতলীর দেউরি নামে পরিচিত ছিল। আর এটিই ছিল নায়েব নাজিম নবাব সামস-উদ-দৌলার আবাস স্থাল। বিশপ হেবার এখানে এসেই তাঁর সাথে দেখা করেছিলেন। ঐতিহাসিক বারদুয়ারী ও নিমতলীর দেউড়ি ঢাকার নায়েব নাজিমের প্রাসাদবাটি ও দরবার হল হওয়ায় একে কেন্দ্র করে নানা ঘটনা নানা ইতিহাসের জন্ম হয়েছে। মুন্সী আবদুর রহিমের পুঁথিতে এ প্রাসাদের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে কাহিনী কাব্য। কোম্পানী আমলের সে ইতিহাস আর ঐতিহ্যের স্বাক্ষী বারদুয়ারী, নিমতলীর দেউড়ি, ছাতা মসজিদ এর কোনটাই এখন আর অক্ষত নেই। ঢাকার স্বাধীনতাকামী বীর নবাব সামস-উদ-দৌলার প্রাসাদ বাড়িটি আমাদের ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সংরক্ষণরে স্বার্থে রক্ষা করা উচিত ছিল। কিন্তু আত্মবিস্মৃত জাতি হিসেবে আমরা অন্যান্য মূল্যবান প্রত্মসম্পদের ন্যায় এ প্রত্মসম্পদগুলোও রক্ষা করতে পারিনি। অনেক সংস্কারের ভেতর দিয়ে বারদুয়ারীর অংশবিশেষ এখনো টিকে আছে তবে তা দূর থেকে দৃশ্যমান নয়। আধুনিক সংস্কারের ফলে এর মূল অংশটুকু কোন রকমে কালের সাক্ষী হয়ে আছে। এশিয়াটিক সোসাইটি অফিসের পেছনটায় গেলে নীমতলী প্রাসাদের অরক্ষিত সদর দরওয়াজা আমাদের অতীত ইতিহাস আর এর শানদার কাহিনী পলকে চোখের সামনে নিয়ে আসে। অনেকেই নবাব সামস-উদ-দৌলার নামটি পর্যন্ত জানেনা । এটি আর যাই হোক আত্মবিস্মৃত জাতি হিসেবে আমাদের বদনামকেই জিইয়ে রাখবে। আজকের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশকে জানতে বুঝতে হলে আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসের বীর নায়ক নবাব সামস-উদ-দৌলাকে আমাদের স্মরণ করা উচিত ।
প্রসঙ্গত বলে রাখা ভাল যে পল্টন স্থাপন করা হয়েছিল আমাদের স্বাধীনতা প্রচেষ্টার একসময়ের নায়ক নবাব সামস-উদ-দৌলাকে দমিয়ে দেবার জন্য সে পল্টন পরবর্তীতে হয়ে ওঠে আমাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার এক উদার বক্ষরূপে। বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী তুর্কী খেলাফত ভেঙ্গে দেবার প্রয়াসের বি্রুদ্ধে এ পল্টন ময়দানে ঢাকার প্রথম জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকার নবাব পরিবার সেদিন মাথার পাগড়ি খুলে তুর্কী খেলাফত রক্ষার আন্দোলনে চাঁদা সংগ্রহ করেছিলেন। সে জনসভাস্থলটি তার ঐতিহ্যকে ধারণ করে কালে তার বক্ষে ধারণ করেছে বহু জনসভার আর জনতার স্বাধীকার স্বাধীনতা আদায়ের নানা ঘোষণার ইতিহাস। এর আশপাশ খেলার মাঠগুলোও আমাদের জননন্দিত নেতাদের নামকে ধারণ করে পল্টন ঐতিহ্যকে সমুন্নত রেখেছে। পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে জনমত গঠনের আন্দোলনে এ পল্টন ময়দান রেখেছে ঐতিহাসিক ভূমিকা। মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানি, বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান সহ জাতীয় নেতৃবৃন্দ এ মাঠে দাঁড়িয়ে যে বক্তৃতা রেখেছেন তাই কালে আমাদের স্বাধীকার আদায়ের আন্দোলনকে স্বাধীনতার আন্দোলনের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। কাগমারী সম্মেলন পরবর্তী মজলুম জননেতা মৌলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানি এ পল্টন ময়দানে দাঁড়িয়েই পাকিস্তানীদের উদ্দেশ্যে তাঁর ২য় ঐতিহাসিক ‘আসসালামু আলাইকুম’ বা বিদায়ী আরজ পেশ করেছিলেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় পল্টন এক বড় স্মৃতি বড় অনুপ্রেরণার স্থাল। দীর্ঘ প্রায় দুশ বছর ইংরেজ গোলামীর পর ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশের অধীন থেকে পাকিস্তানের স্বাধীনতা অর্জিত হলেও মাত্র ২৩ বছরের মধ্যেই আমাদেরকে আবার রুখে দাঁড়াতে হয় পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে। ১৯৪৭-১৯৫২’র ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৬ এ সংবিধান, ১৯৫৮ সামরিক সরকার প্রতিষ্ঠা, ১৯৬৬ এর ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ এর নির্বাচন এবং সর্বশেষ ১৯৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধ এ ধারাবাহিকতাতেই বহু রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা। ন্যায় বিচারক শাহজালাল দাখানি র. যে স্থানটায় বসে অন্যায়কারীদের বিচার করতেন, তাঁর সঙ্গীসাথীদের শহীদ করার মধ্য দিয়ে চতুর্দশ শতকে সে ন্যায়ের পথ রুদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। সে চেষ্টা ফলবতী হয়নি। হযরত শাহ নিয়ামত উলাহ বুতশিকন দুর্নীতির ভুত তাড়াতে নেমে আসেন এ মাটিতে। সে ধারায় গঞ্জে শহীদানের স্মৃতি বিজড়িত স্থানটিতেই এখন আমাদের জাতির গর্ব বঙ্গভবন। দেশে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় এবং স্বাধীনতা রক্ষায় এখান থেকেই পালন করা হয় সিপাহসালারের দায়িত্ব। আজকের পল্টনের কোনে বঙ্গভবন রাষ্ট্রপতির অফিস ও বাসভবন। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তিনি আমাদের সম্মিলিত সামরিক বাহিনীরও প্রধান। পল্টনে বসেই আজ স্বাধীন সার্বভৌম দেশের শাসন পরিচালনা সহ স্বাধীনতা রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী আমাদের বীর সামরিক শক্তির নেতৃত্বও দেয়া হয় এখান থেকেই। এভাবে যে পল্টন থেকে এক সময় আমাদের স্বাধীনতাকামী বীরদের দমন করার বাহিনী এখানে নিয়োজিত থাকতো আজ বিজয়ী শক্তি হিসিবে সে স্থানে বসেই আমাদের জাতীয় স্বাধীনতা আর সার্বভৌমত্ব রক্ষায় মূল কেন্দ্রের দায়িত্ব পালন করতে হয় এখান থেকেই। এখানেই আমাদের বিজয়, আমাদের গর্ব আমাদের অহঙ্কার।

বিহঙ্গ আমার একটি লেখা নিয়েছিলো সেটাইতো ভুলতে বসেছিলাম। কয়দিন যাবৎ বিহঙ্গর মেইলটি দেখছি। কিন্তু সময়াভাবে খোলে দেখা হয়নি। আজ খুললাম এবং দেখে ভাল লাগলো। লেখাটি পাঠকের সামনে আনার ক্ষেত্রে বিহঙ্গ’র এ আয়োজন নি:সন্দেহে চমৎকার। আশাকরি তারা এ পথ ধরে সামনে এগিয়ে যাবে। যারা ধ্যান করে পড়ে তাদেরকে জ্ঞানে ঋদ্ধ করবে। মননকে করবে চাঙ্গা। সকল অনুসন্ধিৎসু পাঠক বন্ধুদের প্রতি অবিরাম ভালবাসা। পড়ুন। বিহঙ্গের পাখায় ভর করে দেশ জাতি ও জগৎকে জানুন। তাঁরা আমার এ গুরুত্বপূর্ণ লেখাটি এর একটি পারিপার্র্শ্বিক আবহ ডেকোরেট করে ছাপার জন্য ধন্যবাদ জানাই। সবার জন্য শুভ কামনা।