চরমপন্থা ও চরমপন্থীর ব্যাপারে ইসলামের ব্যাখ্যা

ভূমিকা

মুসলমানদের ভিতর এমন অনেক ছোট ছোট দল আছে যারা ইসলামকে কঠোরভাবে অনুশীলন করে থাকে। মূলতঃ যারা কঠোরভাবে ইসলামকে অনুশীলন করে থাকে তাদেরকে ছোট করে দেখা বা অবজ্ঞা করা এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। অন্যান্য ধর্মের যারা কঠোর অনুশীলন করে তাদেরকেও ছোট করা আমার উদ্দেশ্য নয়। একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া দরকার চরমপন্থা শুধু মুসলমানদের ভিতরেই নয় বরং অন্যান্য ধর্মের অনুসারীদের মধ্যেও দেখা যায় । যেমন ভারতে বজরং, শিব সেনা, আরএসএস ইত্যাদি। যাদের কারণে ভারতে প্রায়শই দাঙ্গা লাগে। হিন্দু চরমপন্থীদের কারণে এ পর্যন্ত ভারতে কয়েক হাজার দাঙ্গা হয়েছে। গুজরাটে ভয়াবহ দাঙ্গা হয়েছিল হিন্দু চরমপন্থিদেও কারণে। ১৯৯২ তে বাবরী মসজিদ ভেঙ্গে তছনছ করেছিল হিন্দু চরমপন্থিরা। মিয়ানমারে চরমপন্থি বৌদ্ধভিক্ষুরা ধর্মীয় উস্কানি দিয়ে রোহিঙ্গাদের ম্যাসাকার করছে, দেশান্তর করছে, পৈষাচিক বর্বরতা চালাচ্ছে। ধর্মীও চরমপন্থার কারণে রাস্ট্রীয়ভাবে ফিলিস্তিনীদের উপর যুগের পর যুগ চরম নির্যাতন চালিয়ে আসছে ইসরাইল। ধর্মীও কারণে ইরাক, আফগানিস্তানসহ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলমানরা নিঃশেষ হচ্ছে খ্রীষ্টানদের দ্বারা। হিন্দু, ইহুদী ও খ্রীষ্টধর্মে চরমপন্থার ব্যাপারে কোনো দিক নির্দেশনা আছে কিনা আমার জানা নেই তবে ইসলামে এর দিক নির্দেশনা স্পষ্ট ও দ্বার্থহীন।

ব্যক্তিগতভাবে কেউ ইসলামের কঠোর অনুশীলন করলে তাতে ইসলামে আপত্তি থাকলেও সামাজিক কোনো সমস্যা সৃষ্টি হয় না। যেমন একজন ব্যক্তি যদি সারারাত ব্যাপী নফল নামায পড়ে, দিনে রোযা রাখে তাহলে তার নিজের ওপর সে জুলুম করলো কেননা তার শরীরের হক সে আদায় করলো না। কিন্তু  প্রকৃত সমস্যা হলো যারা কঠোরভাবে ইসলামের অনুসরন করে তারা যদি মনে করে তাদের মত অন্য সবাই কঠোরভাবে ইসলামকে অনুশীলন করুক। যদি না করে তাহলে তাদেরকে ভ্রান্ত, গোমরাহ বা কাফের বলে ফতওয়া দেয়া শুরু করে। তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করে। তাদেরকে হত্যা করা জায়েজ মনে করে। তাদের সাথে সামাজিক সম্পর্ক রাখা জায়েজ মনে করে না। তাদের সাথে কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক তারা করে না। তারা নিজেদেরকে উত্তম মুসলিম মনে করে। একমাত্র তারাই সঠিক বলে নিজেদেরকে নিজেরাই সার্টিফিকেট দিয়ে থাকে। এ সার্টিফিকেটের জন্য বড় কোনো মুফতির মতামতের প্রয়োজন মনে করে না। কারণ তারা নিজেরাই নিজেদেরকে সবচেয়ে বড় মুফতি/পন্ডিত বলে মনে করে। তারা পরমতকে সহ্য করতে পারে না। ইসলাম সম্পর্কে তাদের অজ্ঞতাই এ চরমপন্থার মূল কারণ বলে মনে হয়।

ইসলাম কঠোর পন্থা বা একেবারে লাগামহীন কোনটিই পছন্দ করে না। ইসলাম মধ্যম পন্থা পছন্দ করে। রাসূলে আকরাম (স.) বলেছেন, খাইরুল উমুরি আওছাতুহা অর্থাৎ, সব কাজের মধ্যমপন্থা উত্তম। মহান আল্লাহ আমাদেরকে মধ্যমপন্থী উম্মত বলে অভিহিত করেছেন। নিজেদের প্রতি কোনো বিধান যেন কঠিন না হয়ে পড়ে এ জন্য রাসূলে আকরাম (স.) বার বার সতর্ক করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তোমরা মূসা (আ.)-এর অনুসারীদের মত বার বার প্রশ্ন করে দ্বীনের বিধানকে কঠিন করে নেবে না। মহান আল্লাহ বলেছেন, এমন বিষয় তোমরা প্রশ্ন কোরো না যে বিষয় এমনিতেই তোমাদের কাছে প্রকাশ করে দেয়া হয়। মূসা (আ.)-এর অনুসারীরা গরু কোরবানীর ব্যাপারে প্রশ্ন করতে করতে এমন কঠিন করে ফেলেছিল যে, সে গরুটি কিনতে তাদেরকে গরুর সমান ওজনের সোনা দিতে হয়েছিল। তাই রাসূল (স.) এ ব্যাপারে সাহাবিদেরকে সর্তক করেছেন।

ইসলাম সহজ ও স্বভাবজাত জীবন ব্যবস্থা। মহান আল্লাহ বলেছেন, আল্লাহ চান তোমাদের প্রতি তার বিধানকে সহজ করতে, তিনি তোমাদের প্রতি জটিল করতে চান না। সূরা বাকারাহ : আয়াত : ১৮৫। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (স.)-এর সামনে যখন দু’টি কাজ উপস্থিত করা হতো যার একটি করার ইখতিয়ার বা ইচ্ছার স্বাধীনতা আছে তখন তিনি দু’টির মধ্যে সহজটি গ্রহণ করেছেন। সহিহ বুখারি। মূয়াজ ইবনে জাবাল (রা.)-কে আল্লাহর রাসূল (স.) যখন ইয়েমেনের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন তখন তাকে প্রেরণের সময় এ বলে নসিহত করেছিলেন, মানুষের জন্য সহজ করে দেবে, কঠিন করবে না, শুভ সংবাদ দিবে (যাতে তারা আশান্বিত হয়) এবং তাদের মধ্যে বিরূপভাব উষ্কে দেবে না; পরস্পরের কথা শুনবে এবং দূরত্বের বিস্তার ঘটাবে না। আল লু‘লু ওয়াল মারজান, হাদিস নং ২১৩০। তাঁর উম্মতকে শিক্ষাদান প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, সহজতর করো, কঠিনতর করো না ও উত্তম প্রত্যাশা জাগিয়ে দেবে, বিরূপভাব উষ্কে দেবে না। লু‘লু ওয়াল মারজান, হাদিস নং ২১৩১। তিনজন সাহাবি আয়েশা (রা.)-এর কাছে এসে জিজ্ঞেস করেন রাসূল (রা.)-এর আমল কেমন? মা আয়েশা (রা.) যথারীতি জবাব দেন। কিন্তু তারা বলেন, এ আমল রাসূল (স.)-এর জন্য যথেষ্ঠ হতে পারে কিন্তু আমাদের জন্য যথেষ্ঠ নয় কারণ মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলকে জীবনের সমস্ত গুনাহখাতা মাফ করে দিয়েছেন। এরপর তাঁদের একজন বললেন, আমি জীবনে কোনোদিন রোযা ভাঙ্গব না। অন্যজন বললেন, আমি রাতে ঘুমাব না, সারারাত্রি ধরে ইবাদত করব। অন্যজন বললেন, আমি স্ত্রীর সান্যিধ্যে যাব না শুধুই ইবাদত করে কাটাবো। রাসূল (স.) পর্দার অন্তরালে তাঁদের কথা শুনতে ছিলেন। (তাঁদের কথা শেষ হলে) রাসূল (স.) বের হয়ে এসে বললেন, তোমরা কি এরূপ এরূপ বলেছো? তাঁরা বললেন, হ্যাঁ ইয়া রাসূলুল্লাহ (স.)। তখন রাসূল (স.) বললেন, আমি তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আল্লাহকে ভয় করি। আমিই বেশি তাকওয়াবান। কিন্তু আমি রোযা রাখি আবার (নফল রোযা) ছেড়েও দেই। নামায পড়ি আবার ঘুমাই। আমি বিয়ে করেছি। অতএব তোমরা এমন করবে না যেমন তোমরা বলেছ। সহিহ মুসলিম।

আমর ইবনুল আস (রা.) কোনো এক সফরে (শীতকালীন সময়ে) অপবিত্র হলেন। তিনি গোসল না করে মাটিতে গড়াগড়ি দিলেন (কারণ তিনি অসুস্থ ছিলেন) এবং নামায পড়লেন। পরবর্তীতে রাসূল (স.)-এর কাছে এসে বিষয়টি খুলে বললেন, তাঁর কথা শুনে রাসূল (স.) মুচকি হেসেছেন। অর্থাৎ, তাঁর এ কাজের সম্মতি দিয়েছেন। তিরমিজী

অন্য একজন সাহাবি সফরে অপবিত্র হলেন। সঙ্গীসাথীরা তাকে গোসল করার জন্য জোর তাগিদ দিলেন। ঐ সাহাবি ছিলেন অসুস্থ। তাদের কথা মতো তিনি গোসল করলেন। এতে তার রোগ বৃদ্ধি পেল এবং তিনি মৃত্যুবরণ করলেন। এ ঘটনা রাসূল (স.)-এর কাছে বর্ণনা করা হলে, রাসূল (স.) বললেন, তোমরাই তাঁকে হত্যা করেছো, তোমরাই তাঁকে হত্যা করেছো। তিরমিজী। রাসূলে আকরাম (স.) সফররত অবস্থায় নামাযকে কছর করার অনুমতি দিয়েছেন। যোহর আসর, যোহরের সময় এবং মাগরিব ঈশা, ঈশার সময় পড়ার অনুমতি দিয়েছেন।  সুনানে নাসাঈ। রোযা রাখা ফরয কিন্তু অসুস্থ অবস্থায় এবং সফররত অবস্থায় মহান আল্লাহ রোযা রাখাকে ঐচ্ছিক করে দিয়েছেন অর্থাৎ, সুস্থ হলে বা সফর থেকে ফিরে এসে সমান সংখ্যক রোযা রেখে দিলেই চলবে।  সূরা বাকারা : আয়াত- ১৮৪। গরমের সময় রাসূল (স.) যোহরের নামায একটু দেরিতে পড়তে বলেছেন। সহিহ মুসলিম। বনি ইসরাইলদের জন্য অনেক বিধানই খুব জটিল ছিল কিন্তু সেগুলো মহান আল্লাহ আমাদের জন্য সহজ থেকে সহজতর করে দিয়েছেন। যেমন তারা জামে মসজিদ ছাড়া নামায আদায় করতে পারত না কিন্তু আমরা সব জায়গায় নামায পড়তে পারি। তাদের শরীরে কোনো অপবিত্র লাগলে তা চামড়াসহ কেটে ফেলতে হতো কিন্তু আমাদের কেটে ফেলা তো দূরে থাক পানি দিয়ে ধুলেই তা পবিত্র হয়, পানি না পেলে মাটি দ্বারাই পবিত্র হওয়া যায়। এক সাহাবি অপবিত্র জায়গা দিয়ে হেটে এসেছেন। এরপর রাসূল (স.) কে জিজ্ঞেস করেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! এর বিধান কী? রাসূল (স.) বলেন, তুমি কি অপবিত্র জায়গায় হাটার পর পবিত্র জায়গায় হাটোনি? সাহাবি বললেন, হ্যাঁ ইয়া রাসূলুল্লাহ। রাসূল (স.) বললেন, পবিত্র জায়গায় হাটা তোমার পবিত্রতার জন্য যথেষ্ঠ হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, দ্বীনের ভেতর তোমাদের জন্য কোনো সংকীর্নতা রাখা হয়নি। সূরা হাজ্জ : আয়াত- ৭৬

এক সাহাবি রোদে দাঁড়িয়ে ছিলেন। রাসূল (স.) তাঁর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করাতে জবাব দেয়া হলো, সে এরূপ মান্নত করেছে। রাসূল (স.) বললেন, তাকে ছায়ায় আসতে বলো। তাকে কষ্ট দেয়া আল্লাহর কোনো দরকার নেই। মুসনাদে আহমাদ।

অন্য একজন সাহাবি পায়ে হেটে হজ্জ পালন করবেন বলে মান্নত করেছে। রাসূল (স.) জানতে পেরে বললেন, সওয়ারীতে আরোহন করো এবং হজ্জ পালন করো। অর্থাৎ, অযথা কষ্ট করো না। মুসনাদে আহমাদ। নামাযের নিয়ম হলো দাঁড়িয়ে পড়া। এটা নামাযের একটি রোকন। কিন্তু যদি অসুস্থ ব্যক্তি দাঁড়িয়ে নামায পড়তে না পারে তাহলে সে বসে পড়বে, যদি বসেও না পড়তে পারে তাহলে শুয়ে পড়বে এবং ইশারা/ইঙ্গিতে রুকু সিজদা করবে। ইসলামে বলা হয়নি সে যত অসুস্থই থাক না কেন তাকে দাঁড়িয়ে নামায পড়তে হবে। প্রাপ্তবয়স্ক প্রত্যেক মুসলমানের ওপর রোযা ফরয কিন্তু অসুস্থ ব্যক্তি যদি রোযার মাসে রোযা রাখতে না পারে তাহলে সম সংখ্যক রোযা পরে রাখলেই চলবে। অন্যদিকে যারা অতি দুর্বল, অতি বৃদ্ধ তাদেরকে রোযা কাজা করতে বলা হয়নি; বরং বলা হয়েছে যদি তাদের পক্ষে রোযা রাখা সম্ভব না হয় তাহলে একজন মিসকিনকে খাবার দেবে। তাদেরকে বলা হয়নি তোমরা যত দুর্বলই হওনা কেন তোমাদেরকে রোযা রাখতেই হবে। হারাম বস্তু খাওয়া নিষেধ। মহান আল্লাহ বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ মৃত জন্তু, রক্ত, শূকরের গোশত এবং  যার ওপর আল্লাহর নাম ব্যতীত অন্যের নাম উচ্চারিত হয়েছে তা তোমাদের জন্য হারাম করেছেন। কিন্তু যে ব্যক্তি অনন্যোপায় অথচ নাফরমান বা সীমালঙ্ঘনকারী নয়, তার কোনো পাপ হবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। বাকারা : আয়াত- ১৭৩

কখনো জীবননাশের আশঙ্কা দেখা দিলে, জীবনের ওপর চরম নির্যাতন নেমে এলে তখন সাময়িকের জন্য ঈমান গোপন করা জায়েয। মহান আল্লাহ বলেছেন, কেউ ঈমান আনার পর আল্লাহর সাথে কুফুরি করলে এবং কুফুরির জন্য তার হৃদয় উন্মুক্ত রাখলে তার ওপর আপতিত হবে মহান আল্লাহর গযব এবং তার জন্য রয়েছে মহা শাস্তি; কিন্তু তার জন্য নয় যাকে কুফুরির জন্য বাধ্য করা হয়েছে অথচ তার অন্তর ঈমানের ওপর অবিচল। সূরা কাহাফ : আয়াত- ১০৬। এখানে বলা হয়নি ঈমান গোপনকারীও জাহান্নামী। আতা (র.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স.)-এর সময় এক আনসারী রোযা অবস্থায় তার স্ত্রীকে চুমু দেয়। এরপর সে তার স্ত্রীকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করার জন্য নবী (স.)-এর কাছে পাঠালে তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (স.) ও এরূপ করেন। তার স্ত্রী তাঁকে এ কথা জানালে সে বলল, নবী (স.) বেশ কিছু ব্যাপারে নিজের জন্য সহজ সুযোগ রেখেছেন। তাই তাঁর কাছে ফিরে গিয়ে আবার জিজ্ঞেস করো। সে নবী (স.)-এর কাছে পুনরায় গিয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল (স.)! আমার স্বামী বললেন, আপনি নাকি নিজের জন্য কিছু বিষয়ে অতিরিক্ত সুবিধা রেখেছেন যা আমাদের জন্য প্রযোজ্য নয়। তখন নবী (স.) বললেন, আমি তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আল্লাহভীরু এবং আল্লাহর বিধি-বিধান সম্পর্কে আমিই সবচেয়ে বেশি জানি। সিলসিলাতু আহাদিসে সহিহা, হাদিস নং ৩২৯। রোযার সময় দিনের বেলা স্ত্রীর সাথে ঘনিষ্ট হয়ে কথা-বার্তা বা চুমু দেয়া সহজেই ঘটে যেতে পারে। এটার কারণে যদি রোযা নষ্ট হয়ে যায় তাহলে উম্মতের জন্য কষ্টকর হয়ে যাবে তাই রাসূল (স.) বলেছেন, এরূপ করাতে কোনো দোষ নেই। আমি নিজেও এরকম করে থাকি।

রাসূলুল্লাহ (স.) মাঝে মধ্যে সাওমে ওসাল বা ইফতার না করে ধারাবাহিক রোযা রাখতেন। রাসূল (স.)-এর রোযা রাখা দেখে কিছু সংখ্যক সাহাবি এভাবে রোযা রাখা শুরু করেন। এতে তাঁদের স্বাস্থ্য অবনতির মারাত্মক আশঙ্কা দেখা দেয়। তখন রাসূল (স.) তাঁদেরকে এভাবে অর্থাৎ, রাসূল (স.)-এর মত ইফতারবিহীন রোযা রাখতে নিষেধ করেন। তিনি বলেন, তোমরা এরূপ করবে না কারণ আমি রূহানী রিযক প্রাপ্ত হই যা তোমরা পাওনা। সুনানে তিরমিজী। এ রকম রোযা উম্মতের জন্য কষ্টসাধ্য বা অসম্ভব বা স্বাস্থ্যের মারাত্মক ঝুঁকির সম্ভবনা রয়েছে তাই এটাকে নিষেধ করেছেন। তিনি আমাদের জন্য সহজ করে দিয়েছেন। এক বেদুঈন মসজিদে প্রস্রাব করে দেয়, এটা দেখে সাহাবিরা উত্তেজিত হয়ে যান। তখন রাসূলুল্লাহ (স.) সাহাবিদের লক্ষ্য করে বললেন, তাকে প্রশ্রাব করতে দাও। এক বদনা পানি দিয়ে তা ধুয়ে দাও। মনে রাখবে, তোমরা এমন এক জাতিরূপে আবির্ভূত হয়েছো যারা সহজ করে দেবে, কঠিন করবে না। হাদিসটি বুখারি, নাসাঈ ও তিরমিজীতে আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত আছে কিতাবুত তাহারাতে। তাঁর নবুওয়াত ও রেসালাত সম্পর্কে তিনি বলেছেন, নিশ্চয়ই আমি একটি সহিষ্ণু সত্য দ্বীন (প্রচার ও প্রতিষ্ঠার) দায়িত্ব নিয়ে এসেছি। তাবারানীতে আবু উমামা থেকে হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, হে লোক সকল! তোমাদের উপর ঐ সব দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে যা পালন করার সামর্থ তোমরা রাখো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা ততক্ষণ পর্যন্ত ক্লান্ত হন না যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা ক্লান্ত হও। সহিহ জামে আস সগীর, আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, হাদিস নং-৭৮৮৭।

রাসূলুল্লাহ (স.) দুনিয়াতে এসেছিলেন মানুষের জীবনকে হাল্কা করতে, ভার মুক্ত করতে; বাঁধাগ্রস্ত করতে পারে এমন কিছুকে দূর করতে। রাসূলুল্লাহ (স.) নিজের সম্পর্কে বলেছেন, প্রকৃতপক্ষে আমাকে তোমাদের জন্য উপহার স্বরূপ প্রদান করা হয়েছে। ইবনে সাদ এটা বর্ণনা করেছেন এবং আল-হাকিম আল-তিরমিজী মুরসাল (সনদ বিচ্ছিন্ন) হাদিসে আবু সালিহ থেকে বর্ণনা করেছেন। রাসূল (স.) নিজের সম্পর্কে যা বলেছে তা মহান আল্লাহ কুরআনে ঘোষণা করেছেন, আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমতরূপেই প্রেরণ করেছি। সূরা আম্বিয়া : আয়াত- ১০৭। রাসূল (স.) নিজের ব্যাপারে আরো বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা আমাকে কষ্টকর করে প্রেরণ করেন নি, কারো জন্য কষ্ট বহন করে আনুক এমন কাজেও পাঠান নি; বরং তিনি আমাকে শিক্ষক এবং অন্যের কষ্ট লাঘবের উপায় করে প্রেরণ করেছেন। আত তালাক গ্রন্থে ১৪৭৮ নং হাদিস। আল-কুরআনে ইরশাদ হয়েছে- আল্লাহ তাআলা তোমাদের ভার হাল্কা করতে চান, কারণ মানুষকে দুর্বল করে সৃষ্টি করা হয়েছে। সূরা নিসা : আয়াত- ২৮। গর্ভবতী মা ও দুগ্ধমাতার জন্য সিয়াম ভাঙ্গার ব্যবস্থা ইসলাম করে দিয়েছে। এক ব্যক্তির মাথার ওপর ছায়া দেয়া হচ্ছিল এবং বার বার তার গায়ে পানির ঝাপটা দেয়া হচ্ছিল রাসূল (স.) দেখে জিজ্ঞেস করেন তোমরা এরূপ করছো কেন? বলা হলো এ ব্যক্তি রোযাদার। রাসূল (স.) বলেন, সফরকালে রোযা পালনে কোনো পূণ্য নেই। বুরাইদা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (স.)-এর কাছে বসা ছিলাম। ইতোমধ্যে এক মহিলা এসে বলেন, আমি আমার মাকে সদকা হিসেবে একটি ক্রীতদাসী দিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি তো মৃত্যুবরণ করেছেন। নবী (স.) বললেন, তুমি অবশ্যই তোমার দানের পুরস্কার লাভ করবে এবং উত্তরাধিকার হিসেবে ক্রীতদাসী তোমার কাছেই ফিরে আসবে। সহিহ মুসলিম, কিতাবুস সিয়াম। রাসূল (স.) বলেন নি, ক্রীতদাসী অন্যকে আবার দান করে দিতে হবে অথবা তুমি এ সাওয়াব পাবে না বা উত্তরাধিকার হিসেবে এটি আর তুমি পাবে না। সাহল ইবন সা’দ (রা.) থেকে বর্ণিত যে, একদিন এক মহিলা রাসূলুল্লাহ (রা.)-এর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (স.)! আমি আমার জীবনকে আপনার জন্য দান করতে এসেছি। এরপর নবী (স.) তার আপাদমস্তক অবলোকন করে মাথা নীচু করে থাকেন। মহিলাটি যখন দেখেন রাসূল (স.) কোনো ফয়সালা দিচ্ছেন না তখন তিনি বসে পড়েন। এমতাবস্থায় রাসূল (স.)-এর এক সাহাবি বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! যদি আপনার কোনো প্রয়োজন না থাকে, তাহলে এ মহিলাটিকে আমার সাথে বিয়ে দেন। রাসূল (স.) বলেন, তোমার কাছে মোহরের জন্য কি বস্তু আছে? সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল (স.)! আল্লাহর কসম আমার কাছে কিছুই নেই। তিনি বলেন, তুমি তোমার পরিবার পরিজনদের কাছে ফিরে যাও; দেখ কিছু পাও কি-না? এরপর লোকটি চলে যায় এবং ফিরে এসে বলে, আল্লাহর কসম, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি কিছুই পেলাম না। নবী (স.) বললেন, দেখ একটি লোহার আংটি হলেও জোগাড় করে নিয়ে আসো। এরপর সে চলে যায় এবং ফিরে এসে বলে, আল্লাহর কসম, ইয়া রাসূলুল্লাহ! একটি লোহার আংটিও পেলাম না; কিন্তু এ যে আমার তহবন্দ এর অর্ধেক দিতে পারি। এ কথা শুনে রাসূল (স.) বললেন, এই তহবন্দের অর্ধেক দিয়ে কি হবে? তহবন্দটি যদি তুমি পরিধান কর, তাহলে মহিলাটির কোনো আবরণ থাকবে না।

আর যদি সে পরিধান করে তোমার কোনো আবরণ থাকবে না। লোকটি বসে পড়ে এবং অনেকক্ষণ বসে থাকে। এরপর সে ওঠে চলে যেতে থাকে। রাসূল (স.) তাকে ফিরে যেতে দেখে ডেকে আনালেন। যখন সে ফিরে এলো, নবী (স.) তাকে জিজ্ঞেস করেন : কুরআনের কতটুকু তোমার মুখস্থ আছে? সে উত্তরে বলল, অমুক অমুক সূরা মুখস্থ আছে। সে এমনিভাবে একে একে উল্লেখ করতে থাকে। তখন নবী (স.) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি এ সকল সূরা মুখস্থ তিলাওয়াত করতে পার? সে উত্তরে বলল, হ্যাঁ। তখন নবী (স.) বললেন, যাও তুমি যে পরিমাণ মুখস্থ করেছো, এর বিনিময়ে এ মহিলাটি তোমার সাথে বিবাহ দেয়া হলো। সহিহ বুখারি, ৮ম খণ্ড, পৃ-৩৬৩-৩৬৪

রাসূল (স.) তাঁকে বলেননি তুমি এতো এতো টাকা জোগাড় করতে না পারলে বিয়ে করতে পারবে না। মোহর যেহেতু ফরয তাই তা তোমাকে আদায় করতেই হবে এবং তা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিয়ে। তুমি কোথা থেকে টাকা জোগাড় করবে তা তোমার নিজের ব্যাপার। কিন্তু রাসূল (স.) তা করেননি। রাসূল (স.) তাঁকে সহজ করে দিয়েছেন। জটিল করেন নি। তাকে বিয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।

এক ব্যক্তি রাসূল (স.)-এর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (স.)! আমি এ অপরাধ করেছি আমি এখন কি করবো? রাসূল (স.) তাকে বললেন, তুমি কাফফারা আদায় করো। লোকটি বলল, হে আল্লাহর রাসূল (স.)! কাফফারা আদায় করার মত আমার কোনো সম্পদ নেই। রাসূল (স.) বললেন, তুমি অপেক্ষা করো। এমতাবস্থায় রাসূল (স.)-এর কাছে এক ঝুড়ি খেজুর এলো। রাসূল (স.) বললেন, তুমি এগুলো দিয়ে কাফফারা আদায় করো। অর্থাৎ, এগুলো দরিদ্রদের দান করে দাও। লোকটি বলল, হে আল্লাহর রাসূল (স.)! এ জনপদে আমার চেয়ে দরিদ্র আর কেউ নেই। রাসূল (স.) মৃদু হেসে বললেন, তুমি এগুলো নিয়ে যাও এবং তোমার পরিবার পরিজন নিয়ে এগুলো খাও। সহিহ বুখারি

রাসূল (স.) বলেন নি তোমার উপার্জন থেকেই তোমাকে কাফফারা আদায় করতে হবে। তিনি বলেন নি, এগুলো দরিদ্রদের না দিলে কাফফারা আদায় হবে না। তিনি সহজ করে দিয়েছেন। জটিল করেন নি।

রোযার দিনে ইফতারের পূর্ব মুহূর্তে এক সাহাবি সূর্যাস্ত গিয়েছে কি না তা দেখার জন্য খেজুর গাছে উঠলেন। রাসূল (স.) তাকে দেখে বললেন, নেমে এসো। সূর্যাস্ত গিয়েছে কি না তা তুমি নিচ থেকে দেখবে এবং ইফতার করবে। গাছের উপর উঠে সূর্যাস্ত গিয়েছে কি না তা দেখা তোমার জন্য জরুরী নয়। এখানে রাসূল (স.) ইসলামকে সহজ করে দিয়েছেন। কেননা ঐ সাহাবির কাজ যদি রাসূল সমর্থন করতেন তাহলে এখনকার দিনে লোকজন ইফতারের পূর্ব মুহূর্তে গাছে উঠা নিয়ে লাফালাফি শুরু করে দিত। এতে দুর্বল শ্রেণির লোক গাছে উঠে পড়ে দুর্ঘটনার শিকার হতো। আবার এক শ্রেণির লোক বলতো, যেহেতু সাহাবি খেজুর গাছে উঠেছিলেন তাই আমাদেরও খেজুর গাছে উঠতে হবে। প্রতি বাড়িতে খেজুর গাছ লাগাতে হবে। আবার এক শ্রেণির লোক বলতো, গাছ জরুরী নয় বিল্ডিং-এর উপরে উঠলেই হবে। আবার কেউ বলতো, ঐ সাহাবি কতটুকু লম্বা খেজুর গাছে উঠেছিলেন আমাদের ততটুকু লম্বা খেজুর গাছেই উঠতে হবে। আবার কেউ বলতো, সাহাবি কোন বয়সের ছিল, সেই বয়সের লোক উঠতে হবে কারণ চোখের জ্যোতির একটা ব্যাপার আছে ইত্যাদি মতানৈক্য হতো। রাসূল (স.) এ জটিলতা নিরসন করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তুমি নিচে দাঁড়িয়ে যদি দেখ সূর্যাস্ত হয়েছে তখনই ইফতার করবে গাছে উঠার দরকার নেই।

রাসূলে আকরাম (স.) বলেছেন, যে ব্যক্তি দ্বীনের মধ্যে কঠোরতা ও বাড়াবাড়ি আরোপ করবে, দ্বীন তার ওপর প্রবল হয়ে যাবে। সহিহ বুখারি : আদ-দ্বীন ইয়াসির অধ্যায়

তিনি (স.) আরো বলেছেন, যারা কথায় ও কাজে বাড়াবাড়ি করেছে তারা ধ্বংস হয়েছে। সহিহ মুসলিম : ইলম অধ্যায়

নবী (স.) কোনো একটি জিনিস তৈরি করলেন এবং তা সবাইকে গ্রহণ করার অনুমতি দিলেন। কিন্তু কিছু লোক তা গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকে। একথা নবী (স.)-এর কাছে পৌঁছলে তিনি ভাষণ দিলেন, (মুসলিমের বর্ণনায় আছেÑ তিনি ক্ষুব্ধ হলেন, এমন কি তাঁর চেহারায় ক্রোধের প্রকাশ দেখা যায়।) প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা করলেন অতঃপর বললেন, এ লোকদের কি হয়েছে আমি যে জিনিসটি করি তা তারা করা থেকে বিরত থাকছে। আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহকে তাদের চেয়ে বেশি চিনি এবং আমার মনে তাদের চেয়ে বেশি ভয়-ভীতি আছে। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম

আয়েশা (রা.) থেকে আরো একটি বর্ণনা আছে। এক ব্যক্তি রাসূলে করীম (স.)-এর কাছে কিছু মাসায়েল জিজ্ঞেস করতে এলো। দরজার আড়াল থেকে আয়েশা (রা.) তা শুনছিলেন। সে জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রাসূল (রা.)! আমাকে নামায পড়তে হবে কিন্তু আমি ‘জুনুবী’ (নাপাকী) অবস্থায় থাকি। এ অবস্থায় আমি কি রোযা রাখব? রাসূল (স.) জবাবে বললেন, আমাকে নামায পড়তে হবে এমন অবস্থায় যখন আমি জুনুবী থাকি, তখনো আমি রোযা রাখা অবস্থায় থাকি। সে ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল (স.)! আপনি আমার মত নন। আল্লাহ আপনার পূর্বাপর সব গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন। রাসূল (স.) জবাবে বললেন, আল্লাহর কসম! আমি মনে করি, আমি তোমাদের চেয়ে আল্লাহকে বেশি ভয় করি এবং তাকওয়া সম্পর্কে তোমাদের চেয়ে বেশি জানি। মুসলিম : রোযা অধ্যায়

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top