কিশোর মুজিব আর খোলোয়াড় মুজিবের গল্প

শুভ জন্মলগ্নের তিথী পেরিয়ে টুঙ্গিপাড়ার শেখ বাড়ির দক্ষিণা হাওয়া বহমান পরিবেশে কাছারি ঘর, মাস্টার, পণ্ডিত আর মৌলভী সাহেবদের শাসন-বারণেই মুজিবের জীবন চলার পথ শুরু। শৈশব-কৈশর কেটেছে মেঠোপথের ধুলোবালি মেখে আর বর্ষার কাদা পানিতে ভিজে। কিশোর মুজিবের মধুমতিতে সাঁতার কাটা, দৌড়-ঝাপ, দলবেঁধে হা-ডু-ডু, ফুটবল, ভলিবল খেলাই ছিল নিত্য- নৈমত্তিক। সেখানে তিনি ছিলেন নেতার নেতা। কিংবা সামাজিক কোনো দায়িত্বশীল কাজেও সবার আগে মুজিব। সম্ভাবনায় বাতিঘর হয়ে ওঠা কিশোর মুজিবই কালের নৌকা বেয়ে হয়ে গিয়েছেন জাতির পিতা; দেশের স্থপতি।

ফরিদপুরের গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ জন্ম বাবা-মায়ের তৃতীয় সন্তান হিসেবে। হয়তো সেই কারণেই ‘খোকা’ থেকে বঙ্গবন্ধুর বিন্যাস হয়েছে বহুবিদ আখ্যানের মতো। নামী-দামি খাস মুসলিম পরিবারের শেখ লুৎফর রহমান ও সায়েরা খাতুনের চার কন্যা ও দুই পুত্রের মধ্যে মুজিবের গেরামের ইতিবৃত্তের বাইরে যাওয়া হয়নি। বড় হয়ে ‘৭’ বছর বয়সে নথিভুক্ত পড়াশুনা শুরু; যা বর্তমান সময়ে ভাবাই যায়না। আবার ৯ বছর বয়সে গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে এটা সামসাময়িকতাকে ছুঁয়ে ফেলে। কিশোর লগ্নে ১৪ বছরে গিয়ে বেরিবেরি রোগ; কলকাতায় অপারেশন পড়াশুনায় বিপত্তি সবটাই ঘটেছে অভাবিতভাবে।

একজন কিশোর মুজিব অন্য দশটা ছেলে-মেয়ের মতোই পিতা-মাতার আদর-স্নেহ-সাহসে সময় কাটিয়েছেন। শিশু বয়সেই দুঃসাহসী বলিষ্ঠতা দেখিয়ে জানিয়েছিলেন বজ্রমুষ্ঠি ‘বঙ্গবন্ধু’ হয়ে ওঠার উত্থানের কথা। সেখানে যাপিত জীবনের সব ধাপেই মুজিব এক সাহসী ব্যক্তিত্বের নাম। শিশু মুজিব বাঁকে বাঁকে স্বপ্নের ফেরিওয়ালার মতো সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিশোর থেকে যুবক শেখ মুজিবুর রহমান আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহণ করতে করতে ক্রমশ পোক্ত রাজনীতিবিদে পরিণত হচ্ছিলেন। যেখানেই অন্যায়, সেখানেই শেখ মুজিব প্রতিবাদকারী, বলিষ্ঠ সংগঠক।

একটি মুজিবময় গল্প। শেখ মুজিবুর রহমান তখন কিশোর। পড়াশোনার জন্য থাকেন গোপালগঞ্জ শহরে। কদিনের ছুটিতে ফিরেছেন টুঙ্গিপাড়ায়। সে বছর দেখা দেয় ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ফসল হয়নি। গ্রামে দুর্ভিক্ষাবস্থা। মানুষ অর্ধাহারে-অনাহারে। মানুষের কষ্ট কিশোর মুজিবের হৃদয়কে নাড়িয়েছিল। বাড়ি ফিরে পিতার অনুপস্থিতিতেই গোলা থেকে ধান-চাল নিয়ে তিনি গরিব মানুষের মাঝে বিতরণ করলেন। শিশু-কিশোর বয়সেই মুজিব সংবেদনশীল হৃদয় ও মানবিক মূল্যবোধের পরিচয় দিয়েছেন।

আরেকটি আবেগপ্রবণ ঘটনা। একদিন সকালে তাঁর বাড়ি থেকে পড়া শেষ করে আসার পথে এক খালি গা বালককে দেখলেন। জিজ্ঞেস করলে ছেলেটি বললো, তার গায়ে দেয়ার মতো কিছু নেই। সঙ্গে সঙ্গে মুজিব গায়ের গেঞ্জি খুলে ওই ছেলেকে দিয়ে দেন। বাড়ি ফিরে আসেন চাদর গায়ে। বালকের কষ্ট সেদিন মুজিব সহ্য করতে পারেননি।

টুঙ্গীপাড়ায় আবহমান বাংলার আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠেছেন মুজিব। ছেলেবেলা থেকেই তিনি তৃণমূলে গ্রামীণ সমাজের সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না দেখেছেন। প্রয়োজনে সাহসী ভূমিকা রেখেছেন। পাশে দাঁড়িয়েছেন। তবে শৈশবেই তিনি বুঝে নিয়েছিলেন সমাজজীবনে জমিদার, তালুকদার ও মহাজনদের প্রজাপীড়ন শোষণ ও অত্যাচারের চিত্র। ধর্মীয় শিক্ষাকে জেনেই তিনি সজ্ঞানে বুঝেছিলেন অসাম্প্রদায়িকতার চেতনা। তাই গোটা জীবনে তিনি ধর্মীয় ভেদাভেদকে আমলে নেননি।

কিশোর মুজিব ছিলেন বীনাবাক্যে বলা যায় ডানপিটে ও একরোখা স্বভাবের। ভয় বলে কোনো শব্দ তার ডিকশনারিতে ছিলনা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, সত্য ও উচিত কথা বলার অভ্যাস থাকায় কারো সামনেই তিনি কথা বলতে ভয় পেতেন না। প্রধান শিক্ষক গিরীশ বাবু কিশোর মুজিবের সাহসিকতা ও স্পষ্টবাদিতার গুণেই তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। সাহসিকতা, স্পষ্টবাদিতা ও দৃপ্ত-বলিষ্ঠতার জন্যেই তাঁকে কাছে টেনে নিয়েছিলেন স্কুল-কলেজের সবাই। সহপাঠী ও বয়ঃকনিষ্ঠদের মধ্যে নেতৃত্ব দেওয়া বিকাশ ঘটতে থাকে স্কুল জীবন থেকেই। উৎসব-আয়োজনে কিশোর মুজিব ছিলেন নেতার নেতা। আর তার সাথে সঙ্গে শৈশবকাল থেকেই খেলাধুলার নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

পিতা শেখ লুৎফর রহমান ছিলেন একজন উঁচু মানের ফুটবলার। তিনি গোপালগঞ্জ অফিসার্স ক্লাবের ফুটবল দলের অধিনায়কও ছিলেন। এবং একসময়ে ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে তিনি ক্লাবটির সেক্রেটারির দায়িত্বও পালন করেন। ফুটবল খেলাতে শেখ লুৎফর রহমান বিশেষ সুনাম কুড়িয়েছিলেন।

কিশোর মুজিব স্কুলজীবন থেকেই সক্রিয়ভাবে খেলাধুলায় অংশ নিয়েছেন। তার প্রিয় খেলা ছিল ফুটবল। তিনি ছিলেন স্কুল ফুটবল দলের অধিনায়ক। তার উদ্যোগেই ১৯৩৭ সালে গোপালগঞ্জে মিশন স্কুলে গড়ে উঠেছিল ফুটবল ও ভলিবল দল। ব্যক্তিগত পারফরমেন্সে অল্প দিনেই তিনি নিজেকে স্কুলের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে দাঁড় করান। অল্প দিনের মধ্যেই তিনি প্রাদেশিক পর্যায়ে অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে কিশোর মুজিবের এই ক্রীড়াপ্রেম বেঁচে ছিল আমৃত্যু।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর লেখা “অসমাপ্ত আত্মজীবনী”তেও তাঁর বাবার খেলোয়াড়ি-জীবন সম্পর্কে নানা প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। এক স্থানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর বাবা কৃতী ফুটবলার শেখ লুৎফর রহমান সম্পর্কে বলেছেন, “আমার আব্বাও ভাল খেলোয়াড় ছিলেন। তিনি অফিসার্স ক্লাবের সেক্রেটারি ছিলেন। আর আমি মিশন স্কুলের ক্যাপ্টেন ছিলাম। আব্বার টিম ও আমার টিম যখন খেলা হত, তখন জনসাধারণ খুব উপভোগ করত। আমাদের স্কুল টিম খুব ভাল ছিল। মহকুমায় যারা ভাল খেলোয়াড় ছিল, তাদের এনে ভর্তি করতাম এবং বেতন ফ্রি করে দিতাম।”

বঙ্গবন্ধু তাঁর বাবার নেতৃত্বে পরিচালিত ফুটবল দল ও তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত দলটির শক্তিমত্তার দিকে ইংগিত দিয়ে অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বলেছেন, “অফিসার্স ক্লাবের টাকার অভাব ছিল না। খেলোয়াড়দের বাইরে থেকে আনত। সবাই নামকরা খেলোয়াড়। বৎসরের শেষ খেলায় আব্বার টিমের সাথে আমার টিমের পাঁচ দিন ড্র হয়। আমরা তো ছাত্র; এগারজনই রোজ খেলতাম, আর অফিসার্স ক্লাব নতুন নতুন প্লেয়ার আনত।”

রাজনীতিবিদ বঙ্গবন্ধুর সামনে খেলোয়াড় শেখ মুজিবুর রহমানের ক্যারিয়ার হয়তো খুব দীর্ঘ নয়। তারপরও তিনি কতটা খেলাপাগল ছিলেন তার স্বীকারোক্তি অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে-

“ছোট সময়ে আমি খুব দুষ্ট প্রকৃতির ছিলাম। খেলাধুলা করতাম, গান গাইতাম এবং খুব ভাল ব্রতচারী করতে পারতাম।” শৈশব-কৈশোরে তাঁর খেলাধুলার প্রকৃতি সম্পর্কে তিনি অন্যত্র বলেছেন, “ফুটবল, ভলিবল ও হকি খেলতাম।”

বংশীয় উত্তরাধিকারসূত্রেই সমাজকল্যাণের ব্রত-নিষ্ঠা পেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। বাড়িতে আনন্দবাজার, আজাদ, মাসিক মোহাম্মদী ও সওগাতসহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা আর বই-পুস্তকে কিশোর মুজিবকে সমসাময়িক দুনিয়া সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণায় প্রাণিত করেছিল। সেই বয়সেই এলাকার অসহায় ও দুঃস্থদের উন্নয়নভাবনা তাঁর মাথায় জেঁকে বসলো। নবম শ্রেণিতে পড়াকালীন সময়েই মুজিব ‘মুসলিম সেবা সমিতি’র দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়ালেখার খরচ জোগাতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মুষ্টির চাউল সংগ্রহ করলেন। বিক্রিত অর্থ ব্যয় করলেন অসহায় ও গরিব পরিবারের সন্তানদের পড়ালেখার পেছনে।

শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক তখন বাংলার প্রধানমন্ত্রী আর সোহরাওয়ার্দী শ্রমমন্ত্রী। তাঁরা গোপালগঞ্জে এসছিলেন। তাঁদের সংবর্ধনার জন্য সভার আয়োজন করা হয়েছিল। সেই সংবর্ধনা সভার অন্যতম প্রধান স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বঙ্গবন্ধু। তিনি হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে কাজ করেছিলেন। তাঁরা এলেন এবং বেশ কিছু সভায় বক্তৃতা করলেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মিশন স্কুল দেখতে এলেন, স্কুল দেখা শেষ করে তিনি চলে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ মুজিব তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ান, বিনয়ের সঙ্গে বলে উঠেন, ‘স্যার আমাদের একটা আবেদন আছে।’ সোহরাওয়ার্দী হেসে বলেন, ‘বলো বলো। শুনি তোমাদের আবেদন।’ কিশোর মুজিব বলেন, ‘ স্যার আমাদের স্কুলের কয়েকটা ক্লাশের ছাদ ফুটো। বৃষ্টি হলে পানি পড়ে। ক্লাশ করা যায় না। আপনি মেরামতের ব্যবস্থা করতে বলে দেন।’ মুজিবের কথা বলার ভঙ্গি দেখে তিনি মুগ্ধ হলেন। বললেন, ‘এতো আবেদন নয়, ন্যায্য দাবি করেছ। অবশ্যই মেরামত করা হবে। আমি নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছি।’ ওই আয়োজন শেষে শেরেবাংলা নিজ পকেট থেকে নোটবুক বের করে বঙ্গবন্ধুর নাম-ঠিকানা লিখে নিয়েছিলেন। পরে কলকাতায় গিয়ে চিঠি লিখেন। এভাবে কিশোর বয়সেই জাতীয় রাজনীতির স্পর্শ পেয়েছিলেন মুজিব।

কিশোর মুজিব ছিলেন একজন মানবিক মানুষ। তিনি কখনোই অনিয়মকে প্রশ্রয় দিতেন না। কিশোর বয়সে সহপাঠী আবদুল মালেককে স্থানীয় হিন্দুরা ধরে নিয়ে মারধর করে। তিনি বলিষ্ঠ কণ্ঠে এর প্রতিবাদ করেন। অন্য বন্ধুদের নিয়ে মালেককে আটক অবস্থা থেকে মুক্ত করেন। এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়। পুলিশ আসে তাঁকে গ্রেপ্তার করতে। কাছের জনেরা এমনকি পুলিশ কর্মকর্তাও তাঁকে আড়ালে লুকিয়ে থাকার পরামর্শ দেন। তিনি সব অবজ্ঞা করেন। মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার হন। সাজানো মামলা আর মিথ্যে ঘটনা দিয়ে শুরু হলো বঙ্গবন্ধুর জেলজীবন। পরবর্তীকালে অসংখ্যবার তাঁকে কারাবরণ করতে হয়েছে। তাঁর জীবনের মূল্যবান সময়গুলো কেটেছে কারাগারের অন্ধ কুঠিতে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর রাজনৈতিক জীবনে ৪ হাজার ৬৮২ দিন কারাভোগ করেছেন। এর মধ্যে স্কুলের ছাত্র অবস্থায় ব্রিটিশ আমলে সাত দিন কারা ভোগ করেন। বাকি ৪ হাজার ৬৭৫ দিন তিনি কারাভোগ করেন পাকিস্তান সরকারের আমলে। কিশোর মুজিব ১৯৩৮ সালে প্রথম কারাগারে যান। এরপর রাজনীতিবিদ মুজিব ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত তিনি পাঁচ দিন কারাগারে ছিলেন। একই বছর ১১ সেপ্টেম্বর আটক হয়ে মুক্তি পান ১৯৪৯ সালের ২১ জানুয়ারি। এ দফায় তিনি ১৩২ দিন কারাভোগ করেন। এরপর ১৯৪৯ সালের ১৯ এপ্রিল আবারও কারাগারে গিয়ে ৮০ দিন কারাভোগ করে মুক্তি পান ২৮ জুন। ওই দফায় তিনি ২৭ দিন কারাভোগ করেন। একই বছরের ১৯৪৯ সালের ২৫ অক্টোবর থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬৩ দিন এবং ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৯৫২ সালের ২৬ ফেব্রæয়ারি টানা ৭৮৭ দিন কারাগারে ছিলেন।

অনুপম মানবিক হৃদয়ের অধিকারী এই কিশোরই পরবর্তীকালে হয়ে উঠেন ইতিহাসের মহানায়ক। বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি, বাঙালি জাতির জনক।

আরিফ সোহেল : সাংবাদিক

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top